E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: যন্ত্রজীবন থেকে মুক্তি

আজকের দ্রুতগতির জীবনে আবেগের যেন কোনও স্থান নেই। প্রতিযোগিতা, পরীক্ষার চাপ, বুলিং, আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম— সামলাতে গিয়েই মানুষের সামাজিক জীবন বিপন্ন হয়ে উঠছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেন শোষণ আছে, শাসন নেই; ধাম আছে, ধর্ম নেই; মন আছে, মান নেই।

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৫

দীপক দাসের লেখা ‘তোমায় বড় ভালবাসি’ (রবিবাসরীয়, ৮-২) যেন আমাকে সেই গাছগাছালি ঘেরা ছোট গলির রাস্তার মোড়ে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখল। কালবৈশাখীর দিনে আধভেজা হয়ে আম কুড়োনো, পুতুলখেলার ঘরে নিজের সব স্বপ্নকে সত্যি করে তোলা, পাড়ার বিয়েতে নুন কিংবা লেবু পরিবেশন করা, সরস্বতী পুজোয় চুরি করা ফুল দিয়ে সারা রাত জেগে মালা তৈরি করা— সব মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে মিছিল করে চলে গেল।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে আবেগের যেন কোনও স্থান নেই। প্রতিযোগিতা, পরীক্ষার চাপ, বুলিং, আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম— সামলাতে গিয়েই মানুষের সামাজিক জীবন বিপন্ন হয়ে উঠছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেন শোষণ আছে, শাসন নেই; ধাম আছে, ধর্ম নেই; মন আছে, মান নেই। কাজকে অকাজ ঘিরে ফেলেছে। তাই ২৪ ঘণ্টাও কম বলে মনে হয়।যান্ত্রিক সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স মানুষের কাজের সময় ও শ্রম অনেকটা বাঁচায় ঠিকই, কিন্তু যন্ত্রের বশবর্তী হয়ে মানুষ শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপন্ন হয়ে নিজেই এক জীবন্ত যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। ফলত রক্তচাপ, মধুমেহ, স্থূলতার মতো নানান কষ্টকর ব্যাধির শিকার হচ্ছে মানুষ। জীবনের মান কমছে।

গ্রাম্যজীবনে হয়তো আর ফেরা সম্ভব নয়, তবে দিনের মধ্যে কিছুটা সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে হাঁটাচলা করা, প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা, পরিবারের সঙ্গে অন্তত এক বেলা এক সঙ্গে খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম আহার— এ সব মানসিক যান্ত্রিকতা কাটাতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে বলে আশা করা যায়।

গীতিকা কোলে, কলকাতা-৫২

বনফুলের গন্ধ

দীপক দাসের লেখা ‘তোমায় বড় ভালবাসি’ পড়ে মনের সিন্দুকে তুলে রাখা ন্যাপথলিনের গন্ধে ভরা শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের ছবিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমরা যারা গ্রামের কাদা-মাটি মেখে বড় হয়েছি, পাখির পালকে ভর দিয়ে যাদের শৈশবের কুসুমকোমলতা, কৈশোরের লাজুক সুবাস, বৃষ্টিধোয়া শ্রাবণ আর উদ্বেল যৌবন পেরিয়ে গিয়েছে, তারা মর্মে মর্মে অনুভব করি এই হারানো দিনের সুগন্ধমাখা সময়কে।

লেখক তাঁর নিজস্ব উপলব্ধিতে প্রাণের চারাগাছ, জেঠুর খেলাধুলোর প্রশিক্ষণ, রেডিয়ো শোনার দিনগুলি, আশ্রমবাড়ি, বকুলের বাঁশি, সিনেমাপাগল মানুষের ইতিবৃত্ত— সবই তুলে ধরেছেন। মনে পড়ে, স্কুলবেলায় কত দিন কুন্তী নদীর জলের তরঙ্গের খেলা দেখেছি, শালুকফুলের ডাঁটায় মালা গেঁথেছি, নিমফুলের মধু খেয়েছি। তখন রেডিয়ো শোনা মানে ছিল পুজোর আগে হিমপড়া ভোরে সবাই চাদর মুড়ি দিয়ে এক সঙ্গে মহালয়া শোনা, শুক্রবার রাত আটটার নাটক, ছায়াছবির গান— কী আনন্দই না ছিল! এখনও সকাল হলেই রেডিয়ো নিয়ে বসি, আকাশবাণীর প্রাত্যহিকী শোনার নেশায়। এ যেন বার্ধক্যের এক আপন নেশা।

আরও একটি নেশা ছিল। স্কুল থেকে ফেরার পথে ফুটে থাকা অজস্র বনফুলের গন্ধ। আজও এই অবেলায় সেই বনফুলের সুবাস টেনে নিয়ে যায় ছোটবেলার পথের ধারে। জীবনের পরতে-পরতে সেঁটে থাকা এই সুন্দর মুহূর্তগুলো যেন এক-একটি অমলিন অধ্যায় হয়ে ফুটে থাকে।

করবী হাজরা, নিউ টাউন, কলকাতা

অন্যায্য আচরণ

অনিন্দিতা ঘোষালের লেখা ‘কে বহিরাগত, কে নয়’ (৯-২) পড়ে মনে হল, আমরা এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের দেশ ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট, অর্থাৎ ৭৮ বছরেরও বেশি আগে। স্বাধীনতার পূর্বে দেশটি ছিল অখণ্ড; হিন্দু, মুসলমান-সহ সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ এক সঙ্গেই বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক কলহ ও ভেদাভেদ এত প্রকট ছিল না।

কিন্তু দেশভাগের মাধ্যমে যখন দেশটি মূলত হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ভিত্তিক দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হল, তখন থেকেই শুরু হল তীব্র বিদ্বেষ, অশান্তি ও সংঘাত। এর ফলে চরম বিপদে পড়তে হয় পূর্ববঙ্গ তথা অধুনা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের। প্রাণের দায়ে তাঁদের অনেকেই দীর্ঘ দিনের ভিটেমাটি ছেড়ে, এক বস্ত্রে, কোনও রকমে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে।

তখনকার কেন্দ্রীয় সরকারের চোখে তাঁরা ছিলেন শরণার্থী। অনেকেই এ দেশে স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য ‘মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট’ পেয়েছিলেন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বসবাসের উদ্দেশ্যে পাট্টা দেওয়া জমি, এমনকি সরকারি আবাসও বরাদ্দ হয়েছিল বহু ক্ষেত্রে। সুতরাং এত সরকারি স্বীকৃতি ও সুবিধা পাওয়ার পর, এবং দীর্ঘকাল এ দেশে বসবাস করার পর, এক সময় তাঁদের বেআইনি বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হতে পারে, এমন প্রশ্ন আগে তো ওঠেনি।

কিন্তু চলতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কার্যক্রমে সেই আশঙ্কাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। এখানে এ দেশে বহু বছর ধরে বসবাসকারী মানুষও নির্বাচন কমিশনের চোখে ‘সন্দেহজনক ভোটার’, যত ক্ষণ না তাঁদের দাবিমতো উপযুক্ত নথি পেশ করা হচ্ছে। এবং, এ দৃশ্য নতুন নয়। এত দিন আমরা তা দেখেছি অসমে, যেখানে নাগরিকত্বের প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর ভাবে এনআরসি প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এ রাজ্যের এসআইআর-এর মধ্যেও সেই একই দমনোদ্যত চেহারা ফুটে উঠছে। বসবাসের প্রামাণ্য নথি এবং দীর্ঘ দিন ভোট দেওয়ার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ ও আচরণ মোটেই কাম্য নয়।

প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘকাল ভারতে বসবাসকারী মানুষ নির্বাচন কমিশনের বিচারে কী ভাবে ‘সন্দেহজনক ভোটার’ হয়ে উঠতে পারেন? এ সব দেখে সন্দেহের পাল্লাটা আসলে কোন দিকে ঝুঁকছে?

তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি

উলুখাগড়া বুঝি?

‘রাজ্যের ভাগে’ (৩-২) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি গণতন্ত্রের পক্ষে এক জোরালো ও শাণিত প্রতিবাদপত্র। দল এবং প্রশাসনের পার্থক্য অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি, নচেৎ রাষ্ট্র একনায়কের হাতে চলে যেতে পারে। ইদানীং ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করতে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আগেও কি এমনটা ছিল না? উত্তর হল, ছিল; তবে তা এতটা প্রকট ছিল না। দীর্ঘ দিন ধরে শুনে আসছি, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে নাকি রাজ্যের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। কংগ্রেস আমলে এ রাজ্যের উন্নয়নের পথে সেটাই নাকি ছিল বড় বাধা। বর্তমান তৃণমূল আমলেও একই কথা শোনা যাচ্ছে। এবং এ কথার যে কিছুটা সারবত্তা রয়েছে, তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি বলেই মনে হয়।

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’— এই প্রবাদ আজও সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। রাজ্য তথা দেশের সাধারণ মানুষই তার ফল ভোগ করেন। দল ও প্রশাসনকে গুলিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করে, ঘোলা জল সৃষ্টি করে এবং দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়ে তোলে। নেতারা ফুলে-ফেঁপে ওঠেন, আর জনগণ সেই অবস্থাতেই পড়ে থাকেন।

রাহুল গান্ধী একদা সংসদে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, একশো টাকা বরাদ্দ হলে কাজের জন্য খরচ হয় মাত্র এক টাকা। শুনতে বিস্ময়কর লাগলেও কথাটির মধ্যে বাস্তবের ইঙ্গিত রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে বাকি অর্থ কোথায় যায়?

মোট কথা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মহাত্মা গান্ধী ‘সমষ্টির কল্যাণের মধ্যেই ব্যক্তির কল্যাণ নিহিত’— এই যে আদর্শের কথা বলেছিলেন, আজ কোনও রাজনৈতিক দলই তা সত্যিকার অর্থে মানতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। অথচ তাঁরা কি কখনও এ কথা ভেবে দেখেছেন যে, সকলের উন্নয়ন না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়?

দীপায়ন প্রামাণিক, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Quality Technology Emotions Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy