তৃষ্ণা বসাকের ‘কাগজের বই থেকে পর্দার বই’ (রবিবাসরীয়, ২৫-১) শীর্ষক প্রবন্ধটি সময়োচিত বাস্তব দলিল! এই প্রবন্ধে ‘বই’-এর ক্রমবিকাশের ধারাটি সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির হাত ধরে ‘কাগজের বই’-এর রূপান্তর— ‘পর্দার বই’ বা ‘ই-বই’-রূপে। অনাদিকাল ধরে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম মানুষের মুখের ভাষা। এক কথায়, বিমূর্ত এই ভাষার আক্ষরিক রূপই— ‘কাগজের বই’। কারণ ভূর্জপত্র কিংবা তুলোট কাগজ, কাঠ কিংবা ধাতব অক্ষরের ছাপানো রূপ— সবই ছিল কাগজের বই। কিন্তু, আজকাল প্রশ্ন ওঠে, ‘ই-বই’ কি আদৌ চিরাচরিত ‘কাগজের বই’-এর বিকল্প?
বস্তুত, ই-বই ও কাগজের বইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ই-বই আদতে আয়নায় প্রতিফলিত অসৎ প্রতিবিম্বের মতো— যা শুধুমাত্র দেখাই যায়, ধরা-ছোঁয়া যায় না। কাগজের বইতে আছে নতুন-পুরনোর গন্ধ, ই-বইতে যা কখনওই থাকে না। সেখানে আছে শুধু কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল, বিদ্যুৎ-সংযোগ এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিচার্জ করার ঝক্কি। তবে, কম্পিউটার-মোবাইল চুরির অভিযোগ শোনা গেলেও ই-বই চুরির ঘটনা জানা নেই। অন্য দিকে, ভাল কম্পিউটার বা মোবাইলের আয়ু এসে দাঁড়িয়েছে ৫-৭ বছরে। সেগুলি থেকে ই-বই যথাসময় অন্যত্র সরিয়ে না রাখলে বিপদ। কিন্তু, যত্নে রাখলে একটি মুদ্রিত বইয়ের আয়ু শত-সহস্র বছর হতেই পারে! হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার-সংলগ্ন গ্রন্থাগার থেকে প্রায় হাজার বছরের পুরনো চর্যাপদের পুঁথি উদ্ধার করেছিলেন।
এই হাতে লেখা বইয়ের হাত ধরেই তো আজকের ‘ই-বই’এর রমরমা। বই-এর লক্ষ্য স্থির, কিন্তু কম্পিউটার-মোবাইলের লক্ষ্য অনির্দিষ্ট। ‘পুস্তক হস্তে’ কোনও পাঠকের লক্ষ্য কেবল বই পড়াই; কিন্তু ‘গ্যাজেট-হস্তে’ কোনও পাঠকের লক্ষ্য বহুমাত্রিক। ফলে ‘পর্দার বই’-এর পাঠকের নজর ক্রমশ অন্য দিকে ঘুরে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই ‘ই-বই’এর নামে যথেচ্ছ মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি শিকেয় তুলেছে বই পড়ার অভ্যাস। একশো বছর আগেই রবীন্দ্রমননে ধরা পড়েছিল সে কথার পূর্বাভাস। তাই তো ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থে তাঁর অবিস্মরণীয় মন্তব্য— “পাষাণ-গাঁথা প্রাসাদ-’পরে/ আছেন ভাগ্যবন্ত,/ মেহাগিনির মঞ্চ জুড়ি/ পঞ্চ হাজার গ্রন্থ—/ সোনার জলে দাগ পড়ে না,/ খোলে না কেউ পাতা,/ অ-স্বাদিতমধু যেমন/ যূথী অনাঘ্রাতা।”
কুমকুম পাল, চুঁচুড়া, হুগলি
কণ্টকময়
‘সংবাদ ও একটি চরিত্র’ (৩০-১২) শীর্ষক স্নেহাশিস সুরের প্রবন্ধে কল্যণকামী সাংবাদিকদের প্রকৃত মতাদর্শ কেমন হওয়া কাম্য, এই সম্পর্কে উদাহরণ-সহ আলোকপাত করা হয়েছে। বর্তমানে, বিশেষত আজকের ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক প্রেক্ষাপটে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক জন সাংবাদিকের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মানবকল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে সাংবাদিকতা আদর্শবাদী একটি পেশা হলেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, এটি একই সঙ্গে একটি বিপজ্জনক পেশাও। বাস্তবে, বিশ্ব জুড়ে সাংবাদিকতার পেশা আজ গুরুতর সঙ্কটের মুখে।
ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশগত অপরাধ, পাচারচক্র এবং রাজনৈতিক ও দলীয় আক্রোশ— এই সমস্ত কারণেই সাংবাদিকদের উপর মারাত্মক আক্রমণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কঠিন কাজ।
ব্রাসেলস-ভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস’-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাংবাদিকতার কাজে মারা গিয়েছেন ১২৮ জন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। তাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ব জুড়ে ৫৩৩ জন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী বর্তমানে কারাবন্দি, যা গত পাঁচ বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্য দিকে, ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ ও ইউনেস্কো-র কিছু তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী হত্যার দিক থেকে ছিল এক রক্তক্ষয়ী বছর। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল এই দেশেই নয়— বিশ্ব জুড়েই সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা বার বার ভয়ঙ্কর আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই চরম সঙ্কটপূর্ণ বাস্তবতায় এক জন সাংবাদিককে নিষ্ঠা, শ্রম ও সততার সঙ্গে কার্যত প্রাণ হাতে নিয়েই এই বিপজ্জনক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমন দমবন্ধ করা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এক জন কর্তব্যনিষ্ঠ সাংবাদিক বা সংবাদকর্মী কী ভাবে সমাজের মানুষের সঙ্গে আরও গভীর সান্নিধ্য গড়ে তুলে, একাত্মবোধের মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন— সেই প্রশ্নই আজ খুব বড় হয়ে উঠেছে।
পৃথ্বীশ মজুমদার, কোন্নগর, হুগলি
দাবানল হবে?
অতর্কিতে রাজধানী আক্রমণ করে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিরোধ-যুদ্ধে পরাস্ত করে রাজপ্রাসাদের শয়নগৃহ থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন আমেরিকান সৈন্যরা— এমন দৃশ্য দেখেশুনে ঝর্নার নীচে জলপানরত মেষশাবক ও উপরে জলপান করতে ইচ্ছুক বাঘের সেই চিরপরিচিত গল্পটির কথা মনে পড়ে যায়। কত সাহস মেষশাবকের! সে নাকি বাঘমশাইয়ের জল ঘোলা করে দিয়েছে। মেষ আপত্তি তোলে— এতটা নীচ থেকে অত উপরের জল কী ভাবে ঘোলা করা সম্ভব? তখন বাঘের জবাব—“তুই না করলেও এটা তোর পিতার কাজ।” এই অজুহাতেই সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মেষটির উপর।
এখানেও জল ঘোলা করার মতোই অজুহাতের অবতারণা করা হয়েছে। বিবদমান দেশগুলির ঝগড়া থামাতে যেন বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করেছেন এক প্রেসিডেন্ট। নোবেল কমিটিই শুধু এখনও তাঁর এই অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করে উঠতে পারছে না। হঠাৎ করেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল— তাঁদের ভূমিভাগের কাছাকাছি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে থাকবে কেন? ওই ভূখণ্ডও তাঁর চাই। একেবারে শিশুসুলভ বায়না। যাঁরা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রথমে হেসেছিলেন। এখন তাঁদের চোখ কপালে উঠছে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-মিছিলও ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের আমদানির উপর ইচ্ছেমতো দুমদাম শুল্ক বসানো হচ্ছে। তাতে আমেরিকার অর্থনীতিতে ঠিক কতটা জোয়ার আসছে, তা স্পষ্ট নয়; তবে রফতানিকারক দেশগুলির নাভিশ্বাস উঠছে। অন্য শক্তিধর দেশগুলি সহজবোধ্য কারণেই সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইছে না।
আপাতত দেখার বিষয়, মাদুরো-পর্ব থেকে উত্থিত এই স্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হয় কি না। হিংসার কালো ধোঁয়া ইতিমধ্যেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে উঠে আকাশ ঢেকে ফেলছে। আর একটি যোগ হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।
বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি
নজিরবিহীন
‘যুক্তি অরাজকতার, সুপ্রিম-হস্তক্ষেপ’ (১৬-১) প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা একেবারেই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। প্রায় সব দল থেকেই রাজনীতির বিষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা বর্তমান প্রজন্মকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিল্প নেই, স্বাস্থ্য নেই, নারী নিরাপত্তা নেই— আছে শুধু পাঁচালিগান। প্রশ্ন হল, এ দিয়েই কি এই বাংলার ঘোর অন্ধকার দূর করা যাবে? এই রাজনৈতিক অনাচারের বিষবাষ্প ক্রমে ক্রমে বাংলার আকাশ-বাতাসকে আরও ভারী করে তুলছে।
প্রশ্ন হল, কোনও একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কি প্রশাসনকে ব্যবহার করা যায়? এই নজিরবিহীন ঘটনায় বাংলার মানসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিহির কানুনগো, কলকাতা-৮১
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)