রোচনা মজুমদার লিখিত ‘অলীক কুনাট্য বঙ্গে’ (৫-২) সম্পর্কে দু’চারটি কথা। রচনাটি সুপাঠ্য, সুযুক্তিপূর্ণ। শুধু প্রশ্ন, শুরুর দু’লাইন এবং শেষের এক লাইন নিয়ে। শুরুতে তিনি লিখেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে অলীক কুনাট্য চলছে’’, এবং শেষের লাইনটিতে বললেন, ‘‘এই কুনাট্যের পারদ যত চড়ছে, ভারতীয় গণতন্ত্রের আর্তনাদও ততই তীব্র হচ্ছে।’’ 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে যেটা ঘটছে, অর্থাৎ ৩ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় এবং রাতে যা ঘটল— পুলিশ কমিশনারের বাসভবনে সিবিআই হানা, ৪০ জনের এক দলের (আলিবাবা না কি?) ঢোকার চেষ্টা, কলকাতা পুলিশের বাধাদান ও তাদের অপসারণ, এবং তার পরে মুখ্যমন্ত্রীর ধর্নায় বসা— সবটাই কিন্তু অলীকও নয়, কুনাট্যও নয়। আর শেষের লাইনের ‘গণতন্ত্রের আর্তনাদ’ও এটা নয়।

ভারত নিজে পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে না গিয়ে যে গণতন্ত্রটা এ দেশে চালু করেছিল, সেটা ব্রিটেন থেকে আমদানি করা এবং তাও অবিকল নয়। স্বাভাবিক ভাবেই, যা ইংরেজ চরিত্রে মানানসই হয়েছে তা ভারতীয় চরিত্রে ঠিক মাননসই হচ্ছে না। তার ফলে উঠছে এই ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ। তাই এটা কুনাট্য নয়, একটা বিশাল পরীক্ষানিরীক্ষার বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটেনে ১২১৫-র ম্যাগনা কার্টা থেকে ১৯২০-র মহিলাদের ভোটাধিকার প্রাপ্তির যে দীর্ঘ ৭০০ বছরের পরিক্রমা, তার মধ্যে এ রকম ‘কুনাট্য’ অনেক বার ঘটেছে। ছোটখাটোগুলোর উল্লেখ নাই করলাম, রাজা প্রথম চার্লসের সময়ে (১৬২৫-৪৯) ঘটা সিভিল ওয়ার, রাজার মৃত্যুদণ্ড (১৬৪৯), অলিভার ক্রমওয়েল (১৫৯৯-১৬৫৮)-এর কমনওয়েলথ নামক প্রায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকাল, তাঁর জনপ্রিয়তা, আবার রাজা দ্বিতীয় চার্লসের শাসন কালে (১৬৬০-৮৫) সেই ক্রমওয়েলের মৃতদেহকে কবর থেকে তুলে টুকরো টুকরো করে কাটা, টোরি ও হুইন্ডা পার্টির সৃষ্টি, এ রকম কত বিচিত্র ঘটনাবলির মধ্যে দিয়ে চলে তবে সেখানে আধুনিক গণতন্ত্র এসেছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে আজ ব্যতিক্রমী অধিকার পান না। তাঁর একার বা ছোট মন্ত্রিগোষ্ঠীর অঙ্গুলি হেলনে সেখানে কোনও আমলার বদলি বা শাস্তি হয় না। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বা রানি কারও একক হাতে ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে নিয়মের নিগড়ে বাঁধা।

আর সেখানে ভারতে যে গণতন্ত্র চলছে, তা কতকটা সেই পুরনো রাজতান্ত্রিক ধরনের। গণতন্ত্রটা তার বাইরের পোশাক। নেহরু-গাঁধী পরিবারের আমলেও তা-ই ছিল, মোদী আমলেও তা-ই আছে। বরং এই আমলে সেই রাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটা অনেক কটু ভাবে প্রকট হচ্ছে।

বিলিতি শিক্ষায় পরিশীলিত নেহরু-গাঁধী আমলে যা থাকত আবরণের আড়ালে, এখন তা নগ্ন ও বেআব্রু। তাই এক এক করে ধ্বসে পড়ছে আরবিআই, সিবিআই, স্যাম্পল সার্ভে কমিশন ইত্যাদি স্বয়ংশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা, কর্মদক্ষতা ও পরিকাঠামো। তারই পরিণতি আজকের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত। 

যে কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত, সেই সারদা চিট ফান্ডের ১৩টি সংস্থায় মোট অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল ২৪৫৯ কোটি টাকা। (সূত্র: কেন্দ্রীয় অর্থপ্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত সিনহার রাজ্যসভার অধিবেশনে প্রদত্ত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখের প্রতিবেদন)। মমতা-বিরোধী সব দল মিলে এমন চিৎকার জুড়েছে, মনে হচ্ছে ভারতে এইটেই সব থেকে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। মধ্যপ্রদেশের ব্যপম কেলেঙ্কারিতে তো জড়িয়েছিল ৫৫০০০ কোটি টাকা। তা নিয়ে তদন্ত কোথায়? এ রকম অসংখ্য আর্থিক কেলেঙ্কারি ছড়িয়ে আছে সারা ভারত জুড়ে, আর তাতে প্রতারিত মানুষের সংখ্যাও লক্ষ লক্ষ। যে সিবিআই সংস্থা তদন্তে এল, তার দুই শীর্ষকর্তাই তো পরস্পরের প্রতি দু’কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আজ অপসারিত। সুতরাং পশ্চিমঙ্গের সারদা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এত বেশি তৎপর হলে সন্দেহ হয়, উদ্দেশ্যটা অন্য। মোদী-বিরোধী মঞ্চের সবচেয়ে সক্রিয় নেত্রীকে পর্যুদস্ত করাটাই মূল লক্ষ্য। 

তাই, এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তিনটে শক্তির মধ্যে দু’টিকে ব্যক্তিনামে অভিহিত করে সবটা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সিবিআই, পুলিশ কমিশনার, মুখ্যমন্ত্রী সংঘাত বলে চিহ্নিত না করে, দেখানো হচ্ছে সিবিআই বনাম রাজীব কুমার ও মমতা।

প্রশ্নটা হচ্ছে, একটি রাজ্যের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহরের সমস্ত সম্পদ ও মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব যাঁর কাঁধে, তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করতে সেই রাজ্যের মুখ্য প্রশাসককে তা জানানো হবে কি হবে না? দ্বিতীয়ত, এই পুলিশ অধিকর্তার বিরুদ্ধে যেখানে একটা এফআইআর-ও নেই সেখানে তাঁকে আগেই অপরাধী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে কেন? বিশেষত সেই রাষ্ট্রে, যেখানে ২০১৪-য় নির্বাচিত লোকসভা সদস্যদের ৮২ শতাংশই ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত অথচ এখনও দণ্ডপ্রাপ্ত নয় বলে মুক্ত জনপ্রতিনিধি? (সূত্র: প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার ওয়াই এস করেশির ৫-১-২০১৫ তারিখের প্রকাশিত রিপোর্ট)।

এই অভিযানকে অভিসন্ধিমূলক বলে ভাবার আরও একটি কারণ হল, অভিযানকারী দলের সংখ্যা ও সময়কাল নির্বাচন। উদ্দেশ্য যদি থেকে থাকে জিজ্ঞাসাবাদ, তা হলে এক জনকে প্রশ্ন করতে কি ৪০ জন প্রশ্নকর্তা লাগে? 

আর যদি জিজ্ঞাসাবাদটাই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তা হলে রবিবারের সন্ধেটা কি পঞ্জিকা মতে খুব শুভক্ষণ? আর তাঁর দফতরের বদলে কি বাসগৃহটাই শুভস্থল?

আরও একটা লক্ষণীয় দিক হল, বিজেপি-সহ মমতা-বিরোধী দলগুলি প্রচণ্ড ভাবে দেখাতে চেয়েছে, ধর্নায় বসেছেন তৃণমূল দলের নেত্রী, দলীয় মঞ্চে। তা আদৌ ঠিক নয়। ধর্নায় বসেছিলেন একটি রাজ্যের জননির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী, এবং সেটা কেন্দ্রীয় সরকারের সীমালঙ্ঘনকারী একটা ভূমিকার বিরুদ্ধে। আর উর্দি পরে সেখানে যিনি উপস্থিত হয়েছিলেন, তিনি তাঁর অধস্তন এক অফিসার। দল-সেবাকারী সরকারি কর্মী নন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অধস্তন এক অফিসারের নিরাপত্তার স্বার্থে ধর্নায় বসে তার প্রতিবাদ জানালে, তা অলীক কুনাট্য হয় না, বা তাতে গণতন্ত্রের আর্তনাদ ধ্বনিত হয় না। হয় নতুনপন্থী অন্বেষণের এক বলিষ্ঠ ভাবনার প্রকাশ। ভাবুক ভারতবাসী, অনুকরণ না করে খুঁজে বার করুক ভারতীয় গণতন্ত্রের এক নিজস্ব চরিত্র ও পথ। মমতার ধর্না তারই একটা প্রাথমিক পদক্ষেপ। বহুত্ববাদী ভারতের গণতন্ত্রে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক হোক আরও সুনির্দিষ্ট ও নীতিভিত্তিক।

রথিন চক্রবর্তী

কোন্নগর, হুগলি

 

শিক্ষার হাল

আমার কন্যা কিছু না শিখে সপ্তম শ্রেণি হতে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হল। না জানার কারণ হল শিক্ষকের অভাব। অধিকাংশ ক্লাসই ফাঁকা যায়। কারণ শিক্ষক নিয়োগে সরকারের অনীহা। অস্বচ্ছ ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপন। প্রার্থীদের আদালতে গমন। সরকার-আদালত বল ঠেলাঠেলি। নিট ফল, নিয়োগ বন্ধ। হাজার হাজার প্রার্থীকে ওয়েটিং লিস্টে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ও দিকে ‘শ্রী’র আধিক্য। উপলক্ষের আধিক্যে লক্ষ্যটাই (শিক্ষা) চাপা পড়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে সম্প্রতি এক ফিকিরি বুদ্ধিতে বি এড-হীন ইন্টার্ন-এর ভাবনা।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার অভাবে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মেরুদণ্ডহীন হচ্ছে, আর শহরের ধনীদের সন্তান ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষা নিয়ে মেরুদণ্ড সবল করছে।

গৌরব রায়

কৈচর, পূর্ব বর্ধমান

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।