E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বিভাজনে জলসেচন

নির্বাচন-সংক্রান্ত সাংবিধানিক কাজে অভিজ্ঞ যাঁরা, তাঁরা মনে করেছিলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের আগে, এই কাজ করে ওঠা রীতিমতো কষ্টসাধ্য।

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০৩

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনেই তাঁর লেখনীর তিরে এক মোক্ষম প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন— ‘তুমি শুধু পয়লা বৈশাখ?’ (১৫-৪)। রাজ্য বিধানসভার আসন্ন নির্বাচন এবং তাকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন, যার পোশাকি নাম এসআইআর, তাকে ঘিরে ঘরে ঘরে তো বটেই, সামাজিক পরিসরেও যে উত্তপ্ত হাওয়া বয়ে চলেছে, তা রাজনীতি-সচেতন নাগরিকের সঙ্গে আমজনতার কপালেও চিন্তার ভাঁজ কিছু কম ফেলেনি। দিল্লির শাসক দল এবং রাজ্যে তাদের প্রতিনিধিরা এই পর্বের শুরুতেই এক রকম হাঁকডাক করে শুনিয়ে রেখেছেন ভোটার তালিকাকে সাফসুতরো করার কথা। আর এর বিপরীতে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানও শুনিয়ে রেখেছিলেন যে, এসআইআর হতে দেবেন না। কিন্তু রাজ্যের মানুষ জানেন, এসআইআর হয়েছে।

নির্বাচন-সংক্রান্ত সাংবিধানিক কাজে অভিজ্ঞ যাঁরা, তাঁরা মনে করেছিলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের আগে, এই কাজ করে ওঠা রীতিমতো কষ্টসাধ্য। আমরা ভারতবাসীরা এই কিছু দিন আগেও নিজেদের বহুত্ববাদী বলে বেশ একটা গর্ববোধ করতাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র নিয়ে ছিল বড়াই। কিন্তু না, ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নতুন শাসক দলের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সব চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রকে পরিকল্পিত ভাবে সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রচারে দৃশ্যমান এখন শুধু দুই দল— কেন্দ্রের শাসক দল ও রাজ্যের শাসক দল। দুই দলে যাতায়াতের মসৃণ ব্যবস্থা রয়েছে। আর যে সমস্ত দল গণতন্ত্রের এই লড়াইয়ে শামিল, তারা এক রকম যেন ব্রাত্যই, অন্তত প্রচারমাধ্যমে।

উন্নয়নের মানে হয়ে উঠেছে অনুদান বিতরণ। আর বিরোধী পক্ষে, কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের মূল বিষয়— গত দেড় দশকে রাজ্যে চলা বিভিন্ন দুর্নীতির কথা। একটু আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন, একটি বাইক বা স্কুটি নিয়ে কোনও যুবক-যুবতী পিঠে মস্ত ভারী বোঝা নিয়ে উদয়াস্ত ছুটে চলেছেন এ দোর থেকে ও দোরে। তাঁদের কেউ আবার নামীদামি দোকান থেকে খাবার নিয়ে এসে পৌঁছে দিচ্ছেন আমার, আপনার খাবার টেবিলে। দিনান্তে রোজগার বলার মতো নয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা আমরা কোভিডের সময় শুনেছি, পড়েছি। সরকারি স্তরে আশ্বাসের কথা অনেক শুনেছি, কাজ হয়নি কিছু। একশো দিনের কাজ— তাও কী সুন্দর উঠতে বসেছে প্রায়। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভারী সুন্দর দায় ঠেলাঠেলি!

জনসাধারণের জীবন-জীবিকার মূল বিষয়গুলি আলোচনার বৃত্তের বাইরে রেখে চলছে বিভাজনের জমিতে এই জলসেচনের কাজ। নববর্ষ এসেছে, কিছু দিন পরেই আমরা গর্বিত বোধ করব নাচে-গানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে। কিন্তু তাঁর কথা, কাজী নজরুল ইসলামের কথা— সব আমাদের উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তার কোনও প্রকাশ বা প্রয়োগ আমরা আমাদের কাজে দেখতে পাব না।

আড়েবহরে অনাচার বেড়েছে গত দেড় দশকে, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তার কি শেষ নেই? নিশ্চয়ই আছে, থাকবে চিরদিন— যত দিন না খেটে খাওয়া মানুষ তার প্রাপ্য বুঝে নিতে পারছেন।

বরুণ কর, ব্যান্ডেল, হুগলি

মগজ দখল

‘তুমি শুধু পয়লা বৈশাখ?’ শীর্ষক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা।পশ্চিমবঙ্গের যে ঐতিহ্য— স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে এই রাজ্যের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, মহান চরিত্রের মহাপুরুষদের আবির্ভাব এবং তাঁদের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড— তার রেশ যুক্তফ্রন্টের সময়েও দেখা গিয়েছে। পরবর্তী কালে জরুরি অবস্থার সময় ধরপাকড়, জেলে আটকে রাখা, বামপন্থীদের উপর নির্যাতন, গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরা, ছাপ্পা ভোট, রিগিং ও কারচুপি— কোনওটাই বাদ যায়নি। তবুও বঙ্গ রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী বা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সহজে জায়গা করে নিতে পারেনি।

পশ্চিমবঙ্গকে ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান’-এর বলয়ে ঢুকিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে যে প্রকল্পের কথা শোনা যায়, তা কেবল তখ্‌ত দখলের নয়, মন ও মগজ দখলেরও প্রয়াস। মৌলবাদ কোনও ক্ষেত্রেই মঙ্গলজনক নয়, তা হিন্দু সম্প্রদায়ের হোক বা মুসলিম সম্প্রদায়ের। একই ভাবে, ভোটের দিকে তাকিয়ে তোষণের রাজনীতিও কোনও স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাতে পারে না; বরং বহু ক্ষেত্রে তার ফল হিতে বিপরীত হয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন জনগণের সজাগ ও সচেতন হয়ে ওঠা। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নাগরিকের হাতেই— এই বোধ যত দৃঢ় হবে, ততই সমাজ ও রাজনীতির ভিত শক্ত হবে।

বিদ্যুৎ সীট, জগদল্লা, বাঁকুড়া

ক্রান্তিকালে

‘তুমি শুধু পয়লা বৈশাখ?’ শীর্ষক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। সমাজ জুড়ে এত শিক্ষা, বৈভব ও প্রাচুর্যের মধ্যেও গণতন্ত্রের কবচ আমাদের রক্ষা করতে পারছে না। উগ্র জাতীয়তাবাদের অস্ত্রে একই ছাঁচে পুতুল গড়তে চাওয়া রাষ্ট্রনায়কেরা উন্মত্ত শাসনক্ষমতায় নাগরিকদের সাম্যের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন— যেখানে সকলকেই প্রমাণ দিতে হচ্ছে, তিনি খাঁটি ভারতীয় নাগরিক।

আমরা যাঁরা এ রাজ্যে বামমার্গী আদর্শের জল-বাতাসে বড় হয়েছি, তাঁদের পরবর্তী সময়ে মনে হয়েছে— এত দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গবাসীর শিক্ষা, দীক্ষা, চেতনা তথা কাণ্ডজ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে সেই বামপন্থীরা কেন শূন্য হাতে ফিরল? না কি সেই সর্বনাশা ‘দ্বিপাক্ষিক’ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আধারে কালবৈশাখীর ঝড়ে বারংবার সব কিছুই ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায়? তা হলে কি এত দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় রাজ্য জুড়ে বামমার্গের সফরনামা বিফলেই গেল?

সত্যিই কি কোনও কাণ্ডজ্ঞান, সুস্থ চেতনা ও বোধের সমন্বয়ে এই জনগণতন্ত্র গড়ে উঠতে পেরেছে? বরং এখন সময় এসেছে— রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্নিল কল্পনা ত্যাগ করে নিজেদের একেবারে শূন্য থেকে গড়ে তোলার, এবং একটি ভদ্রস্থ সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার। ইতিহাস ভরসা দিলেও এই ক্রান্তিকালে রাজ্যের গণতন্ত্রপ্রিয়, বিবিধ মতপথের ধারক-বাহক মানুষদের দিগ্বিদিকে অলি-গলি-ঘুঁজিতে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া যেন আর কোনও পথ খোলা নেই।

বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিষে জড়িত ‘ওরা-আমরা’ মন্ত্রের জোরে সাক্ষর, নিরক্ষর— সকলের বোধই যেন জলাঞ্জলি হয়ে গিয়েছে। তাই ভয় হয়— এই সর্বনাশা ‘দ্বিপাক্ষিক’ রেষারেষির আদি অবস্থানকে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু এর অন্তটিকে আমরা আদৌ চিনে নিতে পারব তো?

সঞ্জয় রায়, হাওড়া

পার্থক্য ছিল

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘তুমি শুধু পয়লা বৈশাখ?’ শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যে গতিতে রাজ্যের চার দিকে পেশিশক্তি ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে, বাম শাসনের সাক্ষী মানুষদের অনেকেই সামনে না হলেও আড়ালে স্বীকার করবেন, তা বহু ক্ষেত্রেই ছাপিয়ে গিয়েছে বাম আমলের ৩৪ বছরকে।

সে সময়ে শাসক দলের শ্রমিক সংগঠনের দাপটে রাজ্যের কল-কারখানাগুলিতে সারা বছর ধরেই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন লেগেই থাকত, যার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হত। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তৎকালীন শাসক দলের কর্মীদের বিধির আড়ালে সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ ছিল— যা কোনও বাম নেতৃত্বই পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারবেন না। আমলাশোলের মতো ঘটনা ঘটেছিল, সেও বাস্তব। তবুও অনুদান-নির্ভর না হয়েও অধিকাংশ মানুষ কোনও না কোনও উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে দিন তো গুজরান করছিলেন। এমন নেই-রাজ্য তো ছিল না।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government Special Intensive Revision

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy