মেহবুব কাদের চৌধুরীর ‘কবির জন্মদিনে বেহাল চুরুলিয়ার অ্যাকাডেমি, প্রদর্শনী’ (২৮-৫) প্রতিবেদনটি আমাদেরও ক্ষতে নুন ছিটিয়ে দেয়। নজরুলের প্রতি গভীর ভালবাসা থেকেই বেদনা ও প্রতিবাদে মিশে লেখা এই প্রতিবেদনটি— বলার অপেক্ষা রাখে না। নজরুল এবং চুরুলিয়া গোটা বিশ্বের বাঙালির কাছে এক গভীর আবেগের নাম। এ বারের অনুষ্ঠান সেই আবেগকে সম্পূর্ণ ভাবে ধারণ করতে পারেনি; বরং উৎসবের চরিত্রেই যেন এক অপ্রত্যাশিত ‘বদল’ ঘটেছে।
অন্তত জন্মদিন উপলক্ষে কয়েক দিনের এই উৎসবে বাংলাদেশ থেকে যে সব সাধারণ অনুরাগী, গবেষক ও কৌতূহলী মানুষ অবাধে আসতেন, তাঁদের সেই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এ বার চোখে পড়েনি। দেখা যায়নি নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কোনও উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীও। নির্বাচন-আচরণবিধি বা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণ থাকতেই পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই আগামী দিনে এ বিষয়ে আরও আগেভাগে পরিকল্পনা করবেন— এই প্রত্যাশা থাকল।
হতাশা নিয়ে শুধু ফিরে যাওয়ার কথাই নয়। যাঁরা চুরুলিয়াকে নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের অনেকেই এ বার বিষণ্ণতা থেকেই চুরুলিয়ায় যাননি। নথি ও সংগ্রহশালা ইতিহাস সংরক্ষণের অপরিহার্য অঙ্গ। যদি প্রদর্শশালাও কবির জন্মস্থান থেকে হারিয়ে যায়, তবে চুরুলিয়ার হাতে আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকবে? সেই সামগ্রিক বেদনার কথাই তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক। তাঁকে ধন্যবাদ।
আরও একটি বিষয় আমাদের ভাবায়। যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানো হয়, সেখানে পাঠ্যসূচিতে নজরুল কতটা গুরুত্ব পাচ্ছেন? মনে রাখা দরকার, কল্লোল যুগের কবিদের পূর্বসূরি ও অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিলেন নজরুল। এমনকি জীবনানন্দ দাশ-এর ঝরা পালক-এও নজরুলের প্রভাব স্পষ্ট। আশা করি, আগামী দিনে নজরুল সাংস্কৃতিক সমিতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন পথের সন্ধান দেবেন। নজরুলচর্চা ও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলির সংরক্ষণে আরও সক্রিয় ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে— এও আমাদের এক বড় প্রত্যাশা।
রমজান আলি, মিঠাপুকুর, পূর্ব বর্ধমান
বাঙালির দায়
মেহবুব কাদের চৌধুরীর ‘কবির জন্মদিনে বেহাল চুরুলিয়ার অ্যাকাডেমি, প্রদর্শনী’ শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে বড়ই ব্যথিত হলাম। কবি অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নি কো নজরুল/ এই ভুলটুকু বেঁচে থাক/ বাঙালি বলতে একজন আছে/ দুর্গতি তাঁর ঘুচে যাক।”
জন্মভূমিতেই যদি কবি এমন অবহেলার শিকার হন, তবে অন্যত্র তাঁর চর্চার অবস্থার কথা সহজেই অনুমেয়। জন্মদিনের উৎসবে নজরুলপ্রেমীরা কবির প্রদর্শশালা দেখতে পেলেন না। কর্তৃপক্ষের এই অনীহার কারণ কী?
অবিলম্বে প্রদর্শশালার আধুনিকীকরণ ও সংস্কারসাধনের পাশাপাশি চুরুলিয়া নজরুল অ্যাকাডেমির ঐতিহ্য ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক। কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান সংরক্ষণ করা শুধু প্রশাসনের নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজেরও দায়িত্ব।
অশোক কোলে, পানাগড়, পশ্চিম বর্ধমান
অগ্রগামিনী
‘পরিচারিকা থেকে মন্ত্রী, দুর্নীতি দূর করতে চান কলিতা’ (২-৬) শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ে জানলাম পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রাম কেন্দ্রের বিধায়ক কলিতা মাজি প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন। তাঁকে আমরা কুর্নিশ জানাই।
স্বাধীনতার পর প্রায় আট দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েও ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্র এখনও বহাল তবিয়তে টিকে আছে। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ভোটের রাজনীতির বৈতরণি পার হতে অর্থবল ও বাহুবল প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সহায়তাও রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম সোপান হয়ে ওঠে।
সেই প্রেক্ষাপটে কলিতা মাজির গৃহপরিচারিকা থেকে প্রথমে বিধায়ক এবং পরে মন্ত্রী হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এ বার তিনি অর্থনৈতিক ভাবে সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন। গণতন্ত্র তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়, যখন সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব বিধানসভা বা সংসদে নিশ্চিত হয়। আশা করা যায়, কলিতা তাঁর মতো প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবেন। একই সঙ্গে পরিচারিকার মতো শ্রমনির্ভর পেশার মানুষের কাজও সমাজে যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করবে।
তবে এই প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নও স্বাভাবিক ভাবেই সামনে আসে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনকালে কেন এমন গৃহপরিচারিকার কাজ করা কোনও মহিলাকে মন্ত্রিসভায় দেখা গেল না? শ্রেণিসংগ্রাম, সামাজিক ন্যায় এবং প্রান্তিক মানুষের, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নের কথা নানা সভা-সমাবেশে বার বার বলা হয়েছে, এখনও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের মন্ত্রিসভায় প্রান্তিক শ্রেণির নারীর প্রতিনিধিত্ব কতটুকু? ফলে প্রশ্ন জাগে, সেই বক্তব্য কতটা বাস্তব প্রতিশ্রুতি ছিল, আর কতটা বাগ্মিতা?
কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া
অধিকারের কথা
পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা না করে মাত্র দু’-এক দিনের নোটিসে হকার উচ্ছেদ করা নিন্দনীয়। চরম বেকারত্ব, কারখানা থেকে ছাঁটাই এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক সঙ্কট— এই সবই বহু মানুষকে হকারির মতো অনিশ্চিত পেশায় ঠেলে দেয়। বৃহৎ পরিসরের শিল্পায়িত কৃষির বিস্তার, কৃষিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বৃদ্ধি এবং ঋণব্যবস্থার চাপ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র কৃষকদের বিপন্ন করে। অনেকেই জমি হারিয়ে শহরে এসে অনিশ্চিত জীবিকার সন্ধানে নামেন। তাঁদের একাংশ হকারি পেশায় যুক্ত হন।
মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদী অর্থনীতি সর্বদাই একটি উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি সৃষ্টি করে, যাঁদের অনেকেই স্থায়ী কর্মসংস্থান না পেয়ে অনিশ্চিত জীবিকার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। বর্তমানের বহু হকার সেই সমীকরণেরই অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত জীবিকার সঙ্কট নয়; বরং বৃহত্তর শ্রেণিগত বৈষম্যেরও প্রতিফলন। রাষ্ট্র প্রায়ই নগর-পরিকল্পনা ও পুঁজির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলেও শ্রমজীবী মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকার প্রশ্ন সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
আর উচ্ছেদ যদি করতেই হয়, তবে তার আগে উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জীবিকার অধিকার এবং আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পরিচয়।
প্রয়াস মজুমদার, কলকাতা-৩৪
ন্যায় অন্যায়
স্টেশনে অবৈধ দখলদারের সমস্যা দীর্ঘ দিনের। এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল অর্থনীতি, যার কোনও অংশই কর হিসাবে সরকারি কোষাগারে পৌঁছয় না। এই অর্থের একটি অংশ রেলের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীর কাছেও পৌঁছত কি না, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিক ভাবেই ওঠে।
তবে বহু বছর ধরে চলতে দেওয়া এই অবৈধ দখলদারি এক দিনে উচ্ছেদ করতে গেলে মানবিকতার প্রশ্নও সামনে আসে। উচ্ছেদের পর মানুষগুলির জীবন-জীবিকা কী হবে? তাঁদের সংসার কী ভাবে চলবে? তাই উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও থাকা উচিত।
তবে গরিব মানুষ এবং আইনভঙ্গকারীকে এক করে দেখাটা সম্ভবত ঠিক নয়। আইনের শাসনের মূল শর্তই হল, সকলের জন্য সমান আইন। অন্যায় তো অন্যায়ই।
সৌম্যকান্তি মণ্ডল, কলকাতা-১৪৪
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)