E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বলিষ্ঠ চিন্তক

অনীক দত্ত এমন এক জন ব্যক্তিত্ব, যিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে মেধাকে স্থান দিয়েছেন— সমাজ ও মানুষের স্বার্থে। তাঁর কাজে রাজনীতি বিষয় হিসাবে এসেছে, কিন্তু কোথাও তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি।

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৫:৪৭

গৌতম চক্রবর্তীর লেখা ‘রাজনীতি আর মেধার মিশেল’ (৩০-৫) প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই।

অনীক দত্ত এমন এক জন ব্যক্তিত্ব, যিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে মেধাকে স্থান দিয়েছেন— সমাজ ও মানুষের স্বার্থে। তাঁর কাজে রাজনীতি বিষয় হিসাবে এসেছে, কিন্তু কোথাও তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি। বরং তাঁর বক্তব্যের ঋজুতা সমাজকে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাঁর ইস্পাতসদৃশ মেরুদণ্ড নুইয়ে পড়া চেতনাকে আঘাত করে। তাঁর ভাবনার বলিষ্ঠতা রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও ধর্মনির্বিশেষে মানুষকে একসূত্রে বাঁধে এবং চিন্তার প্রসারে উৎসাহ জোগায়।

তাঁর প্রিয় পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মতোই অনীক দত্ত শিল্প ও মেধার এক অনবদ্য রসায়ন সৃষ্টি করেছেন। যে বার্তা তিনি পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, তা দর্শকের কাছে স্পষ্ট ভাবেই পৌঁছেছে। সমাজ গড়ে ওঠে, টিকে থাকে এবং উন্নত হয় মানুষের সৎ কাজের মাধ্যমে; অন্য দিকে অসৎ কাজকে চিহ্নিত করে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়েই সমাজ সুস্থ থাকে। কিন্তু সেই অসঙ্গতিকে চিহ্নিত করে সমাজের সামনে তুলে ধরা সহজ কাজ নয়; তার জন্য সাহস লাগে। সেই সাহস অনীক দত্তের ছিল প্রশ্নাতীত। অথচ সেই কাজ করতে তাঁর কোনও রাজনৈতিক অনুষঙ্গের প্রয়োজন পড়েনি।

যেমন হীরক রাজার দেশে দেশ-কাল অতিক্রম করে স্বৈরতন্ত্র ও অধঃপতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়, তেমনই ভূতের ভবিষ্যৎ যে কোনও অপশাসন ও গুন্ডারাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মেঘমুক্ত নীল আকাশের স্বপ্ন সবাই দেখতে পারে, কিন্তু সেই স্বপ্নগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাধ্য থাকে হাতেগোনা মানুষদের।

অনাড়ম্বর, সহজ ও সরল জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে অনীক দত্ত দেখিয়েছেন, প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য হল সমস্ত আড়ষ্টতাকে অতিক্রম করে ঋজু পথে চলা। নিজের মেধা ও সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে যে যে মাধ্যমে সমাজের জন্য কাজ করতে পারেন, সেখানেই তাঁর দায়িত্ব পালন করা উচিত; তার জন্য কোনও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হয় না।

হেমন্ত গরাই, চন্দননগর, হুগলি

প্রকৃতির বন্ধন

‘গন্তব্য হোক পঞ্চবটী’ (৩০-৫) শীর্ষক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা।

রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ‘উত্তরায়ণ’ বলতে কেবল গৃহস্থাপত্যের সমষ্টি বোঝাত না। গাছপালা, প্রকৃতি ও পরিবেশকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে ওঠা এক সামগ্রিক স্থাপত্য-ভাবনার কথাই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। কবি ছিন্নপত্রাবলী-তে লিখেছেন: “মনে আছে ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভোর হয়ে পোস্টমাস্টার গল্পটা লিখেছিলুম। আমিও লিখছিলুম এবং আমার চার দিকের আলো এবং বাতাস এবং তরুশাখার কম্পন তাদের ভাষা যোগ করে দিচ্ছিল। এই রকম চতুর্দিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে গিয়ে নিজের মনের মতো একটা-কিছু রচনা করে যাওয়ার যে সুখ তেমন সুখ জগতে খুব অল্পই আছে।”

প্রকৃতির সঙ্গে কবিমনের নিবিড় সংযোগের কথা এমন লেখনীর মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, প্রকৃতির দানে ঋদ্ধ কবি যে প্রকৃতির মাঝেই মানুষের মুক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক বন্ধনের উপরই ছিল তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।

কবি স্বদেশভূমির মানবাত্মাকে এক মুহূর্তের জন্যও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবতে পারেননি। প্রবন্ধকারের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে— কুঞ্জকুসুমিত বিশ্বভারতী আজও ছায়াসুনিবিড় থাকলেও, কবির স্বপ্নের শান্তিনিকেতন কি এখনও সেই শ্যামলিমায় জড়ানো?

এক সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন, পশ্চিমের ভোগসর্বস্ব সভ্যতার আদর্শ যদি সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তবে প্রকৃতির ব্যাপক ধ্বংস অনিবার্য; আর প্রকৃতির সেই ধ্বংসের সঙ্গে ধ্বংস হবে মানুষও। তাই আজ থেকে একশো বছর আগে, যখন পরিবেশ নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যায়ে চিন্তাভাবনাই সে ভাবে শুরু হয়নি, তখনই তিনি পরিবেশচর্চাকে নিপুণ ভাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ছাত্রদের কেবল নীরস পাঠ্যসূচির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে তাদের মধ্যে প্রকৃতি ও মানবাত্মার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের অনুভূতি জাগিয়ে তোলাই ছিল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

স্মৃতির গোলক

স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘সব খেলার সেরা’ (রবিবাসরীয়, ১৪-৬) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়ে চোখে জল এসে গেল আমারও। আমারও একটা অন্য রকম কষ্টের স্মৃতি আছে, যেটা সবার কাছে তুলে ধরতে চাই।

তখন আমি ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি। সদ্য বড়সড় জ্বর থেকে উঠেছি। তাই খেলার মাঠ থেকে দূরে আছি কয়েক দিন। এমন সময় এসে গেল সারাদিন-ব্যাপী একটা নক-আউট টুর্নামেন্ট। আমাকেই থাকতে হবে গোলকিপারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। আমি যে কাদা-জলে নেমে আবার খেলছি, তা জানলে মা তেড়ে আসবেন। বুদ্ধি বেরিয়ে এল। নেমন্তন্নবাড়ি যাওয়ার কথা বলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু বুদ্ধদেবের বাড়ির দিকে।

স্বপ্ন পূরণ হল। আমিই ম্যাচের সেরা। কিন্তু না, হিরোর মতো মাঠ ছেড়ে আর বেরোনো হল না। কোথা থেকে মা খবর পেয়ে গিয়েছেন, তাই জ্বলে আগুন। সোজা চলে এলেন মাঠে, হাতে একটা লকলকে জ্যান্ত কঞ্চি। ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’-এর ট্রফি ফেলে তরতরিয়ে উঠে পড়লাম গাছের ডালে। ও-দিকে মা তো কারও কোনও কথা শুনতে রাজি নয়। তত ক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে অদূরের মামাবাড়িতেও। ছুটে এলেন বড়মামা। উপর থেকেই শুনতে পেলাম মামার কথাগুলো। মাকে তিনি বলছেন, “শক্তিকে তাড়াতাড়ি নামতে বল বটগাছটা থেকে। কী সর্বনাশ, ওই ডালেই তো একটা সাপের কোটর রয়েছে!”

মামার কথা শুনে মা ভীষণ ভয় পেয়ে আমাকে গাছ থেকে নামতে বললেন। স্বস্তির কথা, সে-যাত্রা পিঠের চামড়া অক্ষতই রইল আমার। আর আনন্দের কথা, ওই ধোবাপুকুরের মাঠে দাঁড়িয়েই দু’দলের সকলকে বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ করলেন মা। লুচি আর আলুর দমের ভোজ। আজ মা নেই। কিন্তু সে দিনের সেই প্রগাঢ় স্মৃতিটা আজও অমলিন।

শক্তিশঙ্কর সামন্ত, ধাড়সা, হাওড়া

বন্ধু চল

শৈশব কিংবা কৈশোরের বন্ধুদের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কত শত দৃশ্য।

স্কুলের মাঠে এক সঙ্গে খেলা, ক্লাসের ফাঁকে গল্প করা, পড়াশোনায় একে অপরকে সাহায্য করা কিংবা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অভিমান— সব কিছুই যেন আজও মনের কোথাও জীবন্ত হয়ে আছে।

পড়াশোনা, চাকরি, সংসার কিংবা জীবনের নতুন নতুন দায়িত্ব মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। প্রযুক্তির এই যুগে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম থাকলেও অনেক পুরনো বন্ধুত্ব আজ হারিয়ে গিয়েছে। সমাজমাধ্যমে হয়তো হঠাৎ কোনও বন্ধুর ছবি চোখে পড়ে, তখন মনে হয়— কত বছর কথা হয়নি! মনে হয়, যদি আর এক বার সেই সময়ে ফিরে যাওয়া যেত! হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্বের স্মৃতি মানুষকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনই এক ধরনের বিষণ্ণতাও তৈরি করে।

বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ছিল স্বার্থহীন, ছিল আন্তরিকতায় ভরা। আজ যখন চার পাশে সম্পর্কের লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ বেড়ে গিয়েছে, তখন সেই পুরনো বন্ধুত্বের মূল্য আরও গভীর ভাবে অনুভূত হয়। তবে বন্ধুত্ব হারিয়ে যাওয়া মানেই সব কিছুর সমাপ্তি নয়। অনেক সময় দীর্ঘ বিরতির পরও কোনও পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে মনে হয়, সময় যেন থমকে ছিল। কথার ফাঁকে খুলে যায় হাসি, আনন্দ, স্মৃতির ঝাঁপি।

এটাই প্রকৃত বন্ধুত্বের শক্তি, যা দূরত্ব কিংবা সময়ের ব্যবধানেও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। জীবনের পথে আমরা অনেক মানুষকে পাই, আবার অনেককেই হারিয়ে ফেলি। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে থাকে। সেই স্মৃতিগুলোই মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হল সত্যিকারের বন্ধুত্ব। তাই যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, পুরনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত।

মহম্মদ ওয়াসিম, লাভপুর, বীরভূম

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Anik Dutta Bengali Film Director

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy