E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: প্রয়োজন বুঝে নীতি

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসচিব অমিয় চক্রবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি-প্রচেষ্টার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পর্যবেক্ষক ছিলেন।

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ০৬:৩৮

রাজ্যে সম্প্রতি মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে, তার লক্ষ্য নারী-ক্ষমতায়ন এবং তাঁদের আর্থিক বোঝা কিছুটা লাঘব করা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আজ বহু মহিলা কর্মজীবী, স্বনির্ভর এবং নিয়মিত টিকিট কেটে যাতায়াত করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। সে ক্ষেত্রে কেবল লিঙ্গের ভিত্তিতে এই সুবিধা দেওয়া কি পরোক্ষ ভাবে নারীদের এখনও আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল বা পিছিয়ে থাকা একটি শ্রেণি হিসাবে দেখার ধারণাকেই জোরদার করে না? এর পরিবর্তে, এই ধরনের ভর্তুকি যদি লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, তবে তা আরও কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে। যেমন, শিক্ষার্থী ও গবেষক— স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা তাঁদের শিক্ষাজীবনে উল্লেখযোগ্য সহায়তা করবে। চাকরিপ্রার্থী ও বেকার যুবক-যুবতী: যাঁরা চাকরির খোঁজে নিয়মিত সাক্ষাৎকারে যোগ দিচ্ছেন বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন কেন্দ্রে যাতায়াত করছেন, তাঁদের জন্য যাতায়াতে বিশেষ ছাড় অত্যন্ত মানবিক উদ্যোগ হতে পারে। তা ছাড়া অভিভাবক ও গৃহবধূর কথাও ভাবা উচিত। এঁদের মধ্যে যাঁরা প্রতি দিন সন্তানদের স্কুল, কোচিং বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া-নেওয়া করেন, তাঁদের জন্যও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে এই সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে।

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন, জীবিকা এবং সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে নাগরিককে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা। শুধুমাত্র লিঙ্গভিত্তিক বা ঢালাও সুবিধার পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক নীতি গ্রহণ করলে সরকারি অর্থের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সেই সহায়তা পৌঁছে যাবে। আশা করি, এই ক্ষেত্রে লিঙ্গসাম্য ও প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রয়োজন— এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

দীপেন্দু দাস, রানাঘাট, নদিয়া

প্রকৃত বিশ্বমানব

শুভাশিস চক্রবর্তী তাঁর ‘বিশ্বপথিক এক কবি-চিন্তক’ (৮-৫) প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন যে, অমিয় চক্রবর্তী ছিলেন বিশ্বযাত্রী। তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার আদর্শে আস্থাশীল। পশ্চিমি সভ্যতার আলোকোজ্জ্বল পরিসরে গড়ে ওঠা এক কবি-ভাবুক। তাঁর দর্শন চারটি মহাদেশকে এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছে। পারাপার ও পালা-বদল কাব্যগ্রন্থে সেই বিশ্বদৃষ্টিরই প্রকাশ ঘটেছে। তবে দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গাবিধ্বস্ত স্বদেশ যেমন তাঁকে বিচলিত করেছিল, তেমনই ইউরোপেও তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন মানুষের বেদনাবহ ইতিহাস। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দ্বন্দ্ব নয়, দৃষ্টি ও ধ্যানের সমন্বয়ই মানুষের মুক্তির পথ। সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ই ছিল তাঁর বিশ্বদর্শনের সুর।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসচিব অমিয় চক্রবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি-প্রচেষ্টার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পর্যবেক্ষক ছিলেন। ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যুর পর তিনি আমেরিকায় প্রবাসজীবন শুরু করেন। তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে সারা বিশ্বের উদ্বাস্তু মানুষের যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তার ছবি। ফলে কবিমনের শান্তি বার বার ভেঙে গিয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর কাব্যে ধ্বনিত হয়েছে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার এক দুর্মর আকুলতা। তাই তিনি লিখেছেন, “গাঙের স্রোত, ভাটিয়ালি, কীর্তন, দেউল, মুর্সিদ্যার বাড়ি/ ওপারে যাব কেমনে?”

বাংলার স্মৃতিবিধুর বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর ‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’ কবিতায়। জীবনের নানা তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্রতার মধ্যেও আপনজন, স্বদেশ এবং শিকড়ের প্রতি গভীর অনুরাগই তাঁর কবিমানসকে আবিষ্ট করে রেখেছে। বিশ্বমানবতার কবি হয়েও তাঁর চেতনার শিকড় প্রোথিত ছিল বাংলার মাটিতে। সেই স্বদেশেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর পরম প্রশান্তির ঠিকানা।

সুদেব মাল, তিসা, হুগলি

নতুন পথ

“বামের ‘ধর্ম-সঙ্কট’ বোঝালেন বেবি, এল রাজ্য কমিটিতেও” (১৮-৫) শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর স্পষ্ট হয়েছে, গত লোকসভা নির্বাচনে বামেরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিল, তার সবটুকুও তারা ধরে রাখতে পারেনি। কোনও রকমে একটি আসনে জয়লাভ করে এ বার শূন্যের গেরো কাটালেও গোটা রাজ্যে তাদের ভোটের হার জানিয়ে দিচ্ছে, এই জয় মূলত নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ।

এ দেশে ধর্মবিশ্বাসীদের তুলনায় যুক্তিবাদী বা নাস্তিক মানুষের সংখ্যা এখনও অনেক কম। ফলে শুধুই যুক্তির ভিত্তিতে জনসমর্থন গড়ে তুলে সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা বাস্তবসম্মত নয়। শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনের পাশাপাশি তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি অন্ততপক্ষে সংবেদনশীল থাকাও প্রয়োজন।

এই লক্ষ্যেই মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন বা মাও জে দং-এর পাশাপাশি রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীঅরবিন্দ ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো বাঙালি মনীষীদের যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং সমাজসংস্কারের আদর্শকে সামনে আনলে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনো সহজ হতে পারে। অবশ্যই বিজেপির সাফল্যের পথ অনুকরণ করা বাম রাজনীতির পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সময়, সমাজ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই দলকে নিজের পথ নিজে নির্ধারণ করতে হবে।

ভোটের অঙ্ক সব সময়ই জটিল। সেই জটিল সমীকরণ মাথায় রেখেই রাজনৈতিক দলগুলিকে নির্বাচনী কৌশল তৈরি করতে হয়। সেখানে হিসাবের সামান্য ভুলও বড় রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে বাধ্য করে। এ বার বিজেপি তৃণমূল-বিরোধী ভোটকে একত্রিত করার কৌশলেই সাফল্য পেয়েছে। ২০১১ সালে তৃণমূলও বাম ফ্রন্ট-বিরোধী ভোটকে একত্রিত করেই ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস-বিরোধী ভোটের সংহতিই বাম ফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করেছিল। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই প্রবণতা নতুন নয়। তবে এই কৌশল বাস্তবে প্রয়োগ করা মোটেই সহজ নয়।

এ বারের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ফলে বামেদের সামনে যে নতুন রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা শুধু সাংগঠনিক নয়, আদর্শগতও। সেই সঙ্কট মোকাবিলায় বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে তা যেন আদর্শ বিসর্জনের সমার্থক না হয়ে ওঠে, সে দিকেও সমান সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে এটাও সত্য, ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সংগঠননির্ভর বাম ফ্রন্ট যেমন সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছিল, তেমনই যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির ভারে বর্তমান শাসক দলও এক দিন জন-আস্থা হারায়, তবে বামেদের সামনে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ফুটবলের জন্য

‘অলিম্পিক্সে সোনা জিতলেই আট কোটি’ (২০-৫) খবরটি ক্রীড়া জগতে আলোড়ন তুলবে। রাজ্য সরকারের ঘোষিত বিপুল অঙ্কের পুরস্কার এবং সুযোগ-সুবিধা বিভিন্ন খেলায় নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।

তবে একই সঙ্গে আশা করব, নবনিযুক্ত ক্রীড়ামন্ত্রী রাজ্যের উঠতি তরুণ ফুটবলারদের উন্নয়নের জন্যও একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর রূপরেখা তৈরি করবেন। বিশেষ করে অর্থের অভাবেই তো বহু সম্ভাবনাময় ফুটবলারই মাঝপথে হারিয়ে যান।

তাপস সাহা, শেওড়াফুলি, হুগলি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gender Segregation

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy