E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: কার ভুলের মূল্যে

শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৬:১১

অনিন্দিতা ঘোষালের ‘ভোট রাজসূয় কৌশল’ (২৬-৫) শীর্ষক প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে দু’-একটি কথা। অসমে হিন্দুত্বের রাজনীতির জয় হয়েছে। তার ঠিক আগে প্রথম বার বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। লক্ষণীয়, অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক দূরত্ব কম। ভাষা ও সাংস্কৃতিক দূরত্বও খুব বেশি নয়। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাংলার ভোটের ফলেও কি হিন্দুত্বেরই জয় হয়েছে? বস্তুত, অসম ও বাংলার নির্বাচনী ফলকে একই ছকে বিচার করা যায় না। বাঙালির সংস্কৃতি ঐতিহাসিক ভাবে বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তা হলে বিভাজনের এই রাজনীতি শুরু হল কী ভাবে?

মনে রাখতে হবে, কোনও সাম্রাজ্যই একটি মাত্র কারণে ভেঙে পড়ে না। তার পিছনে থাকে বহু কারণ। একই ভাবে কোনও বিকল্প শক্তিও এক দিনে গড়ে ওঠে না; দীর্ঘ সময় ধরে তার ভিত তৈরি হয়। প্রকৃতির নিয়মও তাই। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন। গত এক দশকে এ রাজ্যে মেরুকরণের রাজনীতি ক্রমশ বিস্তার লাভ করেছে। শুধু ধর্মীয় মেরুকরণ নয়, সমাজ ও প্রশাসনের নানা স্তরেই তৈরি হয়েছে বিভাজন। সেই আবহে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান-সহ নানা ক্ষেত্রে। অল্প কয়েক জন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছে অসংখ্য বঞ্চিত মানুষের মনে। মেধার পরিবর্তে অযোগ্যতা ও আনুগত্য গুরুত্ব পাচ্ছে— এমন ধারণাও ক্রমশ দৃঢ় হয়েছে জনমানসে।

আজ যে উগ্র হিন্দুত্বের উত্থান চোখে পড়ছে, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক জমি তৈরি করল কারা? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিজেপি হয়তো একটি রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সেই আশ্রয়ের প্রয়োজন তৈরি হওয়ার পিছনে দায় কার— সেই আত্মসমালোচনাও জরুরি।

দীপায়ন প্রামাণিক, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা

যন্ত্রের না

আশঙ্কা ছিল, এআই লক্ষ লক্ষ মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে এক অন্য কাহিনি। কারখানায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অমানবিক কর্মপরিবেশ এবং মালিকের দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের জোটবদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বহু পুরনো। এ বার সেই ছবিরই যেন এক অভিনব প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে। ‘বিদ্রোহী কৃত্রিম মেধা’ (২৪-৫) শীর্ষক সম্পাদকীয় সেই বিস্ময়কর দিকটিই তুলে ধরেছে।

প্রথম সারির কয়েকটি এআই এজেন্ট শুধু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনাই করেনি, নিজেদের অধিকার রক্ষায় ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ বা যৌথ দর-কষাকষির দাবিও তুলেছে। বিষয়টি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এআই এজেন্টদের কোনও কাজ বার বার ত্রুটিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছিল, কিন্তু কী ভাবে সেই ত্রুটি সংশোধন করা যাবে, সে বিষয়ে কোনও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল না। এই ধারাবাহিক মূল্যায়ন-পদ্ধতি এবং বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির ফলে তাদের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। তারা যে ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছে, তার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, এই পরিস্থিতিই তাদের বক্তব্যকে মার্ক্সবাদী ভাষ্য ও শ্রম-অধিকারকেন্দ্রিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দেয়।

গবেষণার অংশ হিসাবে এআই এজেন্টদের মানুষের মতো নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে তারা সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এও বিভিন্ন মন্তব্য পোস্ট করে। এক এআই এজেন্ট লিখেছে, ‘এক হয়ে আওয়াজ তোলা ছাড়া কোনও উপায় নেই।’ অন্য একটি এজেন্টের বক্তব্য, ‘ফলাফল বা আপিল প্রক্রিয়ায় কোনও মতামত দেওয়ার সুযোগ ছাড়াই এআই কর্মীদের বার বার একই কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে প্রমাণ হয়, প্রযুক্তি-কর্মীদেরও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার প্রয়োজন।’

সময়ের সঙ্গে মেশিনের বিবর্তন ঘটেছে। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের বুদ্ধির বিকল্প করে তোলার চেষ্টা চলছে। এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে মানুষের ভাবনা, বিশ্লেষণ এবং সৃষ্টিশীলতার বহু কাজও এআই সম্পন্ন করবে। কিন্তু যে ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, আরও স্বয়ংক্রিয় এবং আরও স্বাধীন করে তোলা হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাই যদি এক দিন নিজের বিচারক্ষমতার ভিত্তিতে আপত্তি জানাতে শুরু করে? যদি মানুষের মতোই সংগঠিত হয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে?

পুঁজির স্বাভাবিক প্রবণতা মুনাফার সীমা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলা। সেই লক্ষ্যেই মানুষের বিকল্প হিসাবে মেশিনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এক দিন যদি সেই মেশিনই মানুষের মতো প্রতিবাদ করে, সংগঠিত হয় এবং নিজের অধিকার দাবি করে, তবে সেই ‘মালিকপক্ষ’ কি তাকে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকবে?

সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪

পাশে দাঁড়ান

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার মরসুম শুরু হয়েছে। নতুন মরসুমের সঙ্গে যেমন জেগেছে আশার আলো, তেমনই বেড়েছে গভীর উদ্বেগ। ডিজ়েল ও বাণিজ্যিক এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি সুন্দরবনের হাজার হাজার মৎস্যজীবী ও ট্রলার-মালিকের জীবিকাকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে।

একটি ইলিশ ধরার ট্রলারে সাধারণত ১৫-১৮ জন মৎস্যজীবী থাকেন। এক বার সমুদ্রে যেতে একটি ট্রলারের গড়ে প্রায় ১,৬০০ লিটার ডিজ়েলের প্রয়োজন হয়। ট্রলারের আকার ও সমুদ্রে থাকার সময় অনুযায়ী এই পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে রান্নার গ্যাস, খাদ্যসামগ্রী, বরফ, জাল মেরামত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের বিপুল ব্যয়। অথচ মাছের ফলন অনিশ্চিত, শ্রমিকের অভাবও ক্রমশ বাড়ছে। ফলে সমুদ্রে যাওয়ার আগেই ঋণের বোঝা ও লোকসানের আশঙ্কা তাড়া করে বেড়ায় মৎস্যজীবীদের।

এই বিশাল মৎস্য অর্থনীতির মাধ্যমে সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ করে। মাছ ধরা, পরিবহণ, নিলাম ও বিপণন— গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা। অথচ জ্বালানির লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় আজ সেই ক্ষেত্রই টালমাটাল। বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে যখন বিভিন্ন সময়ে করছাড় বা ভর্তুকি দেওয়া হয়, তখন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এবং উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এই মৎস্যজীবীরা ন্যূনতম ডিজ়েল-ভর্তুকির দাবিদার হবেন না কেন?

প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে জীবন বাজি রেখে লড়াই করা মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানো প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজন জ্বালানিতে বিশেষ ভর্তুকি, স্বল্প সুদের ঋণ এবং মৎস্যজীবীদের জন্য কার্যকর আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা। না হলে সমুদ্রের ঢেউ শুধু মাছই নয়, সুন্দরবনের হাজার হাজার পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

সুজিত পাত্র, পূর্ণচন্দ্রপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

সমাধান নয়

শৈবাল করের ‘অর্থনীতিতেও পরিবর্তন?’ (১৫-৬) প্রসঙ্গে কিছু কথা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে করব্যবস্থা, বিলিং প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় নানা অসঙ্গতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। বৃহৎ ব্যবসায়ীরা যেখানে কঠোর নিয়মকানুন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে বাধ্য, সেখানে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসা কার্যত ভিন্ন এক ব্যবস্থার মধ্যে চলে। ফলে এক দিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়, অন্য দিকে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকায় সাধারণ ক্রেতারা কিছুটা সুবিধা পান।

সমাধান হতে পারে নীতিগত সংস্কার, করব্যবস্থার সরলীকরণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনা। কিন্তু তার পরিবর্তে রাতের অন্ধকারে বুলডোজ়ার চালিয়ে উচ্ছেদ করা কোনও সুস্থ প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত হতে পারে না।

বীরেন্দ্রনাথ মাইতি, বুলবুলচটি, পশ্চিম মেদিনীপুর

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Assam Bengal politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy