E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: ধ্বংসের খেলা

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি জনগণের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন, মানুষের দুর্দশার কথা শুনতে পাশে বসে দু’দণ্ড সময় কাটাতে পারেন, আবার এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের পাশে সশরীরে উপস্থিত থাকতেও দ্বিধা করেন না।

শেষ আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৫:৫৫

‘চক্ষুলজ্জা কোথায়’ (৮-১০) শীর্ষক সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। এক রাতের প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের জনজীবনে যখন নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ, ঠিক সেই আবহে কলকাতার রাজপথে প্রতি বৎসরের ন্যায় অনুষ্ঠিত হল ‘বিসর্জনের কার্নিভাল’। আপাতদৃষ্টিতে দু’টি ঘটনার মধ্যে কোনও যোগাযোগ নেই, কারণ একটি পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি ও অন্যটি অযাচিত এবং অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যে মানবিক গুণাবলির কারণে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপুল জনসমর্থনের অধিকারী বলে মনে করেন অনেকে, সেই সমর্থনের প্রতি তাঁরও অকৃত্রিম আস্থা আছে বলেই সপ্তাহব্যাপী উৎসবের আমেজের উপযুক্ত সমাপ্তি টানতে কার্নিভালের আয়োজন করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি জনগণের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন, মানুষের দুর্দশার কথা শুনতে পাশে বসে দু’দণ্ড সময় কাটাতে পারেন, আবার এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের পাশে সশরীরে উপস্থিত থাকতেও দ্বিধা করেন না। এই গুণগুলিকে যতই সমালোচনা করা হোক না কেন, জননেত্রী হওয়ার প্রাথমিক এই শর্তগুলোই তাঁর ভোটের ঝুলি বার বার ভরিয়ে দেয়।

তবে এ বারের কার্নিভালের দিনেই উত্তরবঙ্গের ঘটনা ঘটায় মুখ্যমন্ত্রীর সুযোগ ছিল অনুষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত করার এবং তাঁর মানবিকতাকে আরও একটু বেশি করে প্রকাশ করার। তিনি সে পথে হাঁটেননি। যদিও পরের দিনই তিনি উত্তরবঙ্গ পৌঁছে গিয়েছেন, কিন্তু সমালোচনা বন্ধ করতে সক্ষম হননি। এমনিতেই ভারতের প্রতিটি রাজ্যের যেখানেই যা ঘটুক না কেন, রাজনীতি তার নিজস্ব পথে সেখানে প্রবেশ করবেই। রাজনৈতিক নেতাদের সেই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে যেমন বিজেপি, সিপিএম, তৃণমূল— সবাইকে আসরে নামতে দেখা গিয়েছে।

ইদানীং প্রায় সব ক্ষেত্রে ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’র অজুহাত দিয়ে পাহাড়ি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিকে লঘু করে দেখানোর একটা চেষ্টা চলছে। অথচ, পাহাড়ের গাছ কেটে, রিসর্ট বানিয়ে, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে তছনছ করে উন্নয়নের যে জোয়ার পাহাড়ি পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, সে সম্পর্কে সকলেই মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। মাসুল দিচ্ছেন নিরপরাধ পাহাড়ের অধিবাসীরা, যাঁদের ভাগ্যে ত্রাণটুকুই সম্বল।

উত্তরবঙ্গের মানুষ আবার ফিরে এসেছেন স্বাভাবিক ছন্দে। তাঁরা লড়াকু মানুষ। কিন্তু তাঁদের বিপদ যে তাঁদের সহনাগরিকদের তেমন বিচলিত করেনি, সেই ব্যথা তাঁরা ভুলবেন না কোনও দিন। স্বজন-হারানো পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানানো ছাড়া আর কিছুই কি আমাদের করার নেই?

রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি

মনুষ্যসৃষ্ট

‘বিপর্যয়ের কারণ’ (৭-১০) সম্পাদকীয় সূত্রে কিছু কথা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা ‘রিসর্ট’গুলো এখন শহুরে মানুষদের ক্রমাগত হাতছানি দেয়। আগাম বুকিং না করলে ভরা মরসুমে বা পর্যটন-মাসে এখানে ঠাঁই মেলা ভার। তবে, নগর-জীবনে অভ্যস্ত পর্যটকরা ন্যূনতম সুবিধাটুকু না পেলে যাবেনই বা কেন প্রত্যন্ত-অজানা-অচেনা পাহাড়ি অঞ্চলে? তাই পাহাড়ি গ্রামের এই সব রিসর্টেও গিজ়ার-টিভি’সহ চমৎকার সাজানো গোছানো ঘর পাওয়া যায়। সঙ্গে আর কী কী মেলে সেখানে? অবিরাম বয়ে চলা পাহাড়ি ঝোরা বা বহমান নদী, সারা দিন নাম-না-জানা পাখিদের কলকাকলি, বুক ভরা অক্সিজেন, পাহাড়ের সারি, সামান্য অথচ পরিপাটি আতিথ্য আর নিখাদ নিরিবিলি অবসর-যাপন। তাই হাজার হাজার পর্যটক প্রতি বছর ছোটেন এই ‘অফবিট’ জায়গাগুলোতে, প্রচারের মহিমায় প্রলুব্ধ হয়ে, দু’-তিন দিনের অবকাশ যাপনে। কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করলে, এই উন্নয়ন প্রকৃতিই বা কত দিন সইবে?

উন্নয়নের কারণে তিস্তাকে জায়গায় জায়গায় বেঁধে ফেলা হচ্ছে বাঁধ দিয়ে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের হাত ধরে পাহাড় ভাসছে আলোকমালায়। বিদ্যুৎ নির্মাণে স্বনির্ভরতা আসায় ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটছে। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং, মিরিক প্রভৃতি পর্যটন স্থলে যাঁরা বছর দশ-পনেরো আগে গিয়েছেন, তাঁরা এখন গেলে কেন হাঁপিয়ে ওঠেন? দার্জিলিং এখন কংক্রিটের জঙ্গল। পিছিয়ে নেই কার্শিয়াং, মিরিকও। আর যখন অতিবর্ষণে বাঁধ-জলাধারগুলোতে রক্ষিত জল উপচে পড়ে নীচে নেমে আসে কর্দমাক্ত ভয়াল জলধারায়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় জনপদসমূহ, তখন দুর্যোগকবলিত মানুষের আর্তস্বরে টনক নড়ে প্রশাসনের।

সাধারণত বর্ষা বাদে সারা বছর শুকনো খটখটে থাকে ডুয়ার্সের নদীর তলদেশ। এখান থেকেই অবাধে চুরি হয়ে যায় নদীর বালি। যত্রতত্র বসতি স্থাপন করে নতুন জনপদ গড়ে ওঠে। কেন নিয়মিত ড্রেজিং হয় না ডুয়ার্সের নদীগুলোতে? কেন দিনের পর দিন বিস্তীর্ণ চরায় ঘাস-জমি জন্মায়? কেন রুখে দেওয়া হয় না নদীপথের ধারে-অরণ্যের অভ্যন্তরে অগুনতি রিসর্ট নির্মাণের পরিকল্পনাকে? কারণ, ব্যবসার স্বার্থে যে বিধি-নিষেধগুলোকে মান্যতা দেওয়া জরুরি, সে দিকে নীরব-বধির হয়ে থাকাটাই দস্তুর। পাহাড়ি ঝোরার উৎসমুখ আটকে, গাছ কেটে, ক্রমাগত বনাঞ্চল ধ্বংস করে, নদীর বালি-পাথর চুরি করে নদীর বহমানতাকে রুখে দিয়ে পাহাড়ের চরিত্র বদলে ফেলার জেরেই নেমে আসছে অবর্ণনীয় বিপর্যয়।

পাহাড়ে উন্নয়ন অবশ্যই হবে। তবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার স্পৃহা বাদ দিয়ে। কারণ, প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিতে জানে। সাম্প্রতিক বিপর্যয়গুলো তার চরম দৃষ্টান্ত। ‘খাজনা আদায়’-এর নীতি পরিত্যাগ করতে হবে, এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিনা উন্নয়নের জোয়ার বন্ধ থাকুক কিছু দিন।

ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-১২৫

উন্নয়নের জেরে

কিছু দিন আগেই একটানা বৃষ্টির জেরে উত্তরবঙ্গের তিস্তা, মহানন্দা ও তোর্সা নদীতে অস্বাভাবিক জলস্ফীতি দেখা দেওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে জনজীবন চরম ভাবে বিপর্যস্ত হয়। ভূমিধসের কারণে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতির জন্য কেবল বৃষ্টি নয়, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ এবং এখানকার ভঙ্গুর ভূতাত্ত্বিক কাঠামো সমান ভাবে দায়ী। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, দার্জিলিং-সিকিম এলাকায় মাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রধানত দু’ধরনের শিলাস্তর দেখা যায়— ‘ডালিং গ্রুপ’ এবং ‘দামুদা সিরিজ়’। এই দুই শ্রেণির শিলাস্তরের মধ্যে ডালিং গ্রুপ গঠিত হয়েছে স্লেট, মেটাপেলাইট এবং সিস্ট-এর মতো শিলায়। আর, দামুদা সিরিজ়ের ভিত্তি হল বেলেপাথর, কাদাপাথর, শেল ও কয়লা। তা ছাড়া এই এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি থ্রাস্ট লাইন বা চ্যুতিরেখা। যেমন, দার্জিলিং ও সিকিম এলাকায় ‘মেন বাউন্ডারি থ্রাস্ট’, ‘হিমালয়ান ফ্রন্টাল থ্রাস্ট’, ‘মেন সেন্ট্রাল থ্রাস্ট’-এর মতো থ্রাস্ট লাইন রয়েছে, যেগুলো গঠনগত ভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং ভঙ্গুর।

গোটা এলাকা যে ধরনের শিলা দিয়ে তৈরি, তাতে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেই কাদার প্রবাহ তৈরি হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় পাহাড় থেকে ধস নামতে শুরু করে। তবে মূল সমস্যাটি মানবসৃষ্ট। গত কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করে যে রেলের সুড়ঙ্গ, হোমস্টে ও রিসর্ট নির্মাণ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়েছে, তাতে মাটির বাঁধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই অবাধ নির্মাণের উপর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। সময় থাকতে ব্যবস্থা না করলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

শুভজিৎ বসাক, কলকাতা-৫০

কর্কশ

কিছু কিছু বাইকের হর্ন এতই জোরালো যে পাশ দিয়ে গেলে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এই ধরনের হর্নের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

উজান চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-৩২

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy