E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অযথা আগ্রাসন

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পাশাপাশি অপহরণ ও কারারুদ্ধ করা হয় তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও।

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৭

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাখঢাকহীন আগ্ৰাসন’ (৮-১) বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। সেই প্রসঙ্গে কিছু বলার জন্য এই চিঠি। ভেনেজ়ুয়েলার উপর আমেরিকার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন আজ আর গোপন কোনও বিষয় নয়। বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি ভান্ডারের অধিকারী, লাতিন আমেরিকার এই দেশটি নিজের সম্পদের উপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করলেই আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাকে কোণঠাসা করতে উদ্যত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ, নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার এবং বিরোধী শক্তিকে উস্কে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভেনেজ়ুয়েলাকে অস্থির করে তোলাই মূল লক্ষ্য।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পাশাপাশি অপহরণ ও কারারুদ্ধ করা হয় তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলা হয়। সরকারি কর্তাদের প্রভাবিত করা, কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া থেকে শুরু করে মাদক পাচারে মদত দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে সে দেশের ‘ফার্স্ট লেডি’র বিরুদ্ধেও। আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রপুঞ্জের নীতিকে উপেক্ষা করে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ যে কতটা বিপজ্জনক নজির, তা আজ গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে। রাশিয়া, চিন-সহ বহু দেশ এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করছে। এই পরিস্থিতিতে ভেনেজ়ুয়েলার সাধারণ মানুষ চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট, ওষুধ ও খাদ্যের অভাব এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছেন, যার জন্য দায়ী মূলত আমেরিকা।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান ভারতের বিদেশনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ দেশ হিসেবে ভারত সব সময় জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ভেনেজ়ুয়েলার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান অনেকটাই নীরব ও দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। ভারত এক দিকে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ভেনেজ়ুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়, অন্য দিকে আমেরিকার কৌশলগত চাপ এড়াতেও সচেষ্ট। এর ফলেই নীতিগত স্পষ্টতার অভাব দেখা যাচ্ছে। অথচ ভারত যদি সত্যিই উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে স্পষ্ট ভাবে বলতে হবে, কোনও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সে দেশের জনগণ, কোনও বিদেশি শক্তি নয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন অনৈতিক ও নিন্দনীয়। আজ বিশ্ব যখন নতুন করে যুদ্ধ, দখলদারি ও আধিপত্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন ভারতের উচিত ভেনেজ়ুয়েলার মতো দেশগুলির পাশে দাঁড়িয়ে নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জানানো। অন্যথায়, স্বাধীন বিদেশনীতির ঐতিহ্য ক্রমশ অর্থহীন হয়ে পড়বে।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

সাম্রাজ্যবাদী

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাখঢাকহীন আগ্রাসন’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ অগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময় এক গণহত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকার নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল। মেকি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজা উড়িয়ে দশকের পর দশক ধরে আমেরিকা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে, নয়তো নিজের পুতুল সরকার গঠন করেছে। কোনও দেশ পরোক্ষে দখল করার আগে আসল সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য গোপন রেখে সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে কিছু ‘আখ্যান’ তৈরি করে তারা। যেমন, ইরাক দখলের আগে প্রচার করা হয়েছিল সাদ্দাম হুসেনের হাতে রাসায়নিক অস্ত্র আছে। তেমনই ভেনেজ়ুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে তাঁদের অপহরণ করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, আমেরিকার অলিখিত সাম্রাজ্যবাদী নীতির কোনও হেরফের হয় না।

উগ্র জাতীয়তাবাদ (‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ বা ‘মাগা’)-এর উপর ভর করে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক রাখঢাকহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত সেই নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। প্রবন্ধে যথার্থই উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘটনাপ্রবাহ উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে, তার ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কী ভাবে এই আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শেষাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভদ্রেশ্বর, হুগলি

জোটবদ্ধ

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনার সঠিক বিশ্লেষণ করেছেন প্রবন্ধকার। আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের গণতন্ত্রের পূজারি হিসেবে ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁদের কার্যকলাপ বিশ্ববাসীর কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্ব থেকেই আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান যে ভাবে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দু’টি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে আজও এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গিয়েছে। এই অমানবিক হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ সংগঠিত হলেও আমেরিকা এখনও নিজেকে এতটুকুও সংশোধন করেনি।

সম্প্রতি ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক যে ভাবে অপহরণ করা হল, তা-ও নজিরবিহীন। মূলত তেল ও খনিজ সম্পদের দখল নেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য। এ দিকে, প্যালেস্টাইনে ধ্বংস ও গণহত্যা চালাতে ইজ়রায়েলের রাষ্ট্রনায়ক নেতানিয়াহুকে পূর্ণ মদত জুগিয়ে এসেছেন ট্রাম্প। এই ধ্বংস আর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত সংগঠিত হলেও আমেরিকার প্রশাসন কিন্তু তুলনামূলক ভাবে নির্বিকারই ছিল। আড়ালে থেকেও যে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনে মদত দেওয়া যায়, এটি তার এক অনন্য নজির। অন্য দিকে, বিশ্ব জুড়ে চলছে লাগামহীন শুল্ক-সন্ত্রাস। সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়েও কী ভাবে বিভিন্ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যায়, সেই চক্রান্তেও নেতৃত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। সব মিলিয়ে বিশ্ব জুড়ে এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমেরিকার বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে। এ সময় দুর্বল রাষ্ট্রগুলিরও উচিত জোটবদ্ধ ভাবে রুখে দাঁড়ানো। সরাসরি সংঘাতের পথ এড়াতে ‘কৌশলগত নীরবতা’ আত্মরক্ষার উপযুক্ত হাতিয়ার হিসেবে সাময়িক ভাবে বিবেচিত হলেও, এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রনায়কদেরই সচেতন থাকা উচিত। সামরিক আগ্রাসনের হাত থেকে নিজের দেশের ভূখণ্ডকে বাঁচাতে হলে মিত্রশক্তি খুঁজে নিয়ে জোট বাঁধতেই হবে। সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটের বিকল্প কিছু হয় না।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

আত্মহত্যা রোধে

সেক্টর ফাইভ থেকে এসপ্ল্যানেড রুটের মেট্রো স্টেশনগুলিতে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে ট্রেন এবং প্ল্যাটফর্মের দরজা এক সঙ্গে খোলে। সে ক্ষেত্রে কারও আত্মহত্যার অভিপ্রায় থাকলেও, তা করা কঠিন। ব্লু লাইনের সব স্টেশনেও যথাশীঘ্র এমন ব্যবস্থা চালু করলে হয় না?

মৌসুমী দে, কলকাতা-৩৭

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america venezuela

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy