ভোট, দলবদল এবং নিধিরাম সর্দারের সম্বল
গণতন্ত্র আঁকড়ে বেঁচে থাকা জনগণ যেন নীতিটি চাক্ষুষ করেই ভোট দিতে পারেন। নইলে যত দিন যাবে, জনগণ পরিণত হবে নিধিরাম সর্দারে আর ভোট প্রহসনে।
vote

প্রতীকী চিত্র।

শেষ হল রাজ্যের প্রথম দফার ভোট। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে আরও এক বার নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেল জনগণ। ভোট অবাধ হল কিনা, সে বিষয়ে অবশ্য কেন্দ্র-রাজ্য দ্বিধাবিভক্ত। দ্বিধাবিভক্ত সরকার ও বিরোধী পক্ষ। বিরোধী পক্ষের প্রার্থী পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সরব। ডিসিআরসি-তে অবস্থান। হুলুস্থুল। গণতন্ত্রের এত বড় মরিয়া আয়োজনে এটুকু উত্তেজনা স্বাভাবিক। গত পাঁচ বছরে শাসক দলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর বিরোধীদের যৎকিঞ্চিৎ কর্মসূচি। এর ফাঁকফোকর দিয়ে যদি বা ভোট দেওয়ার মতো কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল, তাতেও ভোটটি যথাস্থানে পৌঁছবে কি না সন্দেহ। বুথের ভিতরে-বাইরে উন্নয়ন উপস্থিত। তার সৌজন্যে ইভিএম মাটিতে গড়াগড়ি। কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে এসে নিষ্কর্মা। কেন? ভোট তো শান্তিতে পরিপূর্ণ। বাহিনীকে নামালে রাজ্য কমিশনের পক্ষে সত্যের অপলাপ হয় না? 

এত ঘনঘটা পেরিয়ে জনগণ যাঁকে ভোট দিল, তিনি ভোটের পরে কোন চিহ্ন বহন করবেন— যে চিহ্নে ভোট পেলেন নাকি যে চিহ্ন সুবিধাজনক হয়ে দেখা দেবে! এটা আবার জনগণ জানে না। যিনি পুনর্নির্বাচনের দাবিতে হইচই করলেন, তিনি গত পঞ্চায়েত ভোটে ক্ষমতাসীন দলে ছিলেন। এই লোকসভা ভোটে বিরোধী পক্ষের প্রার্থী। যে সব ভয়ানক অন্যায়ের অপবাদ তিনি এ বার সরকার পক্ষকে দিয়েছেন, শোনা গেল, সে অপবাদগুলি নাকি গত বারের ভোটে স্বয়ং তাঁরই ভূষণ ছিল। ভোটের মরসুমে যৎপরোনাস্তি খাটাখাটুনির পরে দলবদলের এটুকু পৌষমাস অবশ্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রাপ্য। কিন্তু জনগণের সর্বনাশ। এ হেন প্রার্থীরা তাদের বহুকষ্টে প্রয়োগ করা অধিকারের ফলটি নিয়ে কবে কোথায় চলে যাবেন, তা নিয়ন্ত্রণ করার কোনও উপায় জনগণের নেই। মজার কথাটি হল, জনগণ যদিও বা চিহ্ন দেখে ভোট দেয়, জয়লাভ করেন কিন্তু প্রার্থী। অতএব, দলবদলের আইনি ফাঁক দিয়ে গণতন্ত্রের ফল বদলে যায়। 

ফাঁকটি কী রকম? ধরা যাক, জনগণ বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দিল এবং প্রার্থী জিতলেন। কিন্তু সামগ্রিক ফলে শাসকদলই আবার জয় লাভ করায় সেই প্রার্থী নানাবিধ তৎপরতায় দল বদলে শাসকদলে চলে গেলেন। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের মতামতের আর কোনও গুরুত্ব রইল না। শুধু তা-ই নয়, সেই সাংসদ বা বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের একমাত্র অধিকার কিন্তু থাকল সংসদ বা বিধানসভার স্পিকারের কাছে। আইনসভার স্পিকার পদটি যেহেতু নির্বাচনে জয়ী শাসক দলের দ্বারা নির্ধারিত হয়, কাজেই, খুব স্বাভাবিক ভাবেই দলের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি কারও ক্ষতি করতে চান না। 

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

১৯৮৫ সালে সংসদে পাশ হওয়া অ্যান্টি ডিফেকশন অ্যাক্ট বা দলত্যাগ বিরোধী আইনটিতে স্পিকারের হাতে এতটাই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, স্পিকারের বিবেচনার পরে কেউই এই বিষয় নিয়ে অন্য কোথাও কোনও আপিল করতেও পারবে না। অতএব এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টেরও কিছু করার নেই তো বটেই, রাষ্ট্রপতির পক্ষেও কোনও পদক্ষেপ করা অসম্ভব। দলত্যাগ বিরোধী আইনে পরিষ্কার বলা আছে যে, তিনটি মাত্র পরস্থিতিতে এক জন সদস্যের ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর করা যেতে পারে। প্রথমত, যদি সেই সদস্য নিজে থেকেই নিজের দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। দ্বিতীয়ত, যদি সেই সদস্য সংসদ বা বিধানসভায় দলবিরোধী কাজকর্ম করেন। আর তৃতীয়ত, যদি তিনি নিজে থেকে অন্য দলে যোগদান করেন। এই তিনটি ক্ষেত্রেই সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। তবে সদস্যপদ খারিজের পূর্ণ দায়িত্ব এবং ক্ষমতা স্পিকারের। এই দায়িত্ব পালন না করলে দল সেই কাজের বিরুদ্ধে কোর্টে বা অন্য কোথাও যেতেও পারবে না। 

তা হলে? যে দলকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ ভেবে নিয়ে জনগণ বাতিল করল এবং তার বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জেতাল, সেই জয়ী সদস্যই যদি অদূর ভবিষ্যতে সেই ‘ফ্যাসিস্ট’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক’ দলের মন্ত্রী হয়ে বসেন, তবে জনগণের বিমূঢ় হয়ে থাকা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। তিনি জনগণকে নীতির পাঠ শেখাতে তাদেরই করের টাকায় হেলিকপ্টার ভাড়া করতেই পারেন। তার পরে জনসভা। প্রশাসনিক সভা। কিন্তু প্রার্থী যে একই রইলেন। নীতিশিক্ষার পাঠে জনগণ বিস্মিত। ভাষণও ভীষণ। আগের বার যাদের তুলোধোনা করেছেন, এ বার তাদের জয়গান। আগের বার যাঁরা তুলোধোনা করেছিলেন, এ বার তাঁদের সম্বোধন স্নেহে আপ্লুত। জীবন কোনও রকমে ধারণ করতে যাদের বুদ্ধি ব্যবহার করার উপায় নেই, তারা রোদে-জলে ভিজে, পুড়ে এক দিনের জন্য মাঠে। আর বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ফেসবুকে। তর্কাতর্কি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ বটে। তবে এখন ফেসবুকে তর্ক দূরস্থান, চায়ের দোকানেও স্পিকটি নট। তর্কাতর্কিতে যদি মার খাওয়ার উপক্রম হয়! দলবদলের খেলায় তো সকলেই কমবেশি ‘কনফিউজড’! এতটা বিভ্রান্তি গণতন্ত্রের লক্ষণ কি না কে জানে! 

এই গণতন্ত্রের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি কী? যে দেশে সংস্কৃতিমনস্ক, কৃতী জনগণের অভাব নেই, সেখানে আইনসভার সদস্য হতে গেলে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত করা নেই কেন? মেনে নেওয়া গেল যে, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি শিক্ষাগত যোগ্যতার উপর নির্ভর করে না। কিন্তু শিক্ষা মানবসম্পদের গুণগত মান যে বাড়িয়ে দেয়— এ কথা তো অস্বীকার করা চলে না। অবশ্য দুর্ভাগ্য এই যে, এ দেশে প্রাক্তন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মন্ত্রীকে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করতে হয় সঙ্গত কারণেই। এবং দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বের সেই দফতরটি ঘাড় থেকে নামার পরে জানা গেল, তিনি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও পদার্পণ করেননি।  রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গ্রাহ্য হবে না। কারণ হিসেবে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু দোষটি প্রাক্তন মন্ত্রীর নয়। গণতন্ত্রের। আইন পাশ হওয়ার পরে সেই আইন পরিমার্জনের কোনও ক্ষমতা আইনব্যবস্থার হাতে নেই। অতএব, জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলেও গণতন্ত্রকে নীরব থাকতে হবে। আমেরিকার শাসনব্যবস্থায় কিন্তু আমেরিকার সর্বোচ্চ কোর্ট, অর্থাৎ ফেডারাল কোর্টের হাতে সে ক্ষমতা আছে। সিনেট এবং হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে পাশ হওয়া আইনটি জনস্বার্থ বিরোধী কি না, ফেডারাল কোর্ট তার বিচার করতে পারে। 

স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই বিষয়গুলি কি ভেবে দেখা যায় না? গণতন্ত্রকে স্বাস্থ্যবান করে তুলতে শুধু ভোটের হার বাড়ানোকেই লক্ষ্য না করে জনপ্রতিনিধিদের প্রার্থীপদ বিচারের ক্ষেত্রে আরও কড়া নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হোক দলগুলিকে। ব্যক্তিস্বার্থে হোক বা নীতিগত কারণে— কোনও ভাবেই কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সারাজীবনে তিন বারের বেশি দলবদল করতে পারবেন না। ভোটে জিতে দলবদল করতে পারবেন না কোনও প্রার্থী। আর নির্দল হলে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারবেন না। এই মহান গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা এবং সংবেদনশীলতা রক্ষা করতে এই আইন প্রবর্তনও খুব জরুরি যে,  কোনও রাজনৈতিক দল ভোটে জেতার পরে বিরোধী বা অন্য দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারবে না। নীতিগত ভাবে জোট হলে তা হোক ভোটের আগেই। গণতন্ত্র আঁকড়ে বেঁচে থাকা জনগণ যেন নীতিটি চাক্ষুষ করেই ভোট দিতে পারেন। নইলে যত দিন এগোবে, জনগণ পরিণত হবে নিধিরাম সর্দারে আর ভোট পরিণত হবে প্রহসনে।

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

  • সকলকে বলব ইভিএম পাহারা দিন। যাতে একটিও ইভিএম বদল না হয়।

  • author
    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলনেত্রী

আপনার মত