×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৭ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

চিকিৎসা সংকট মেটাতে বাজার কাজে লাগতে পারে

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়
০৭ জুলাই ২০১৭ ১৪:১৭

রাজ্যের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বিল প্রবল উত্তেজনা তৈরি করেছে, চার দিকে কেমন যেন শ্রেণিসংগ্রামের হাওয়া। এক পক্ষে সাধারণ মানুষ, যাঁরা এই সব ব্যবস্থায় বেজায় খুশি, আর অন্য পক্ষে চিকিৎসকরা (যাঁরা আবার কখনও কখনও রোগীও বটেন) যাঁরা বেজায় ক্রুদ্ধ। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগের মূল অভিমুখ দুটো— চিকিৎসায় গাফিলতি আর অকারণ খরচ বাড়িয়ে দেওয়া। রোগীর জন্য যা করার দরকার (এবং চুক্তি) ছিল সেটাই করা হল কি? এবং, যে দাম দেওয়া হল সেই পরিষেবাই পাওয়া গেল কি? চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ আসলে এই প্রশ্নগুলির চার দিকেই ঘুরতে থাকে। কিন্তু চিকিৎসা পেশার মানবিক দিকটি বাদ দিলে, এই প্রশ্ন আসলে যে কোনও চুক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আপনার গাড়ি সারান যিনি, তাঁর সঙ্গে করা চুক্তির ক্ষেত্রেও সমস্যা একই— গাড়ির মেকানিক ভাল যন্ত্রাংশের টাকা নিয়ে সেটা দিলেন কি না অথবা এত রকম যন্ত্রাংশ বদলের আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল কি না, এই সব প্রশ্ন গাড়ি মালিককেও বিব্রত করে। এই দু’ধরনের চুক্তির মধ্যে পার্থক্য কিছু থাকলে সেটা এই যে, জীবন বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না!

চিকিৎসা নিয়ে রোগী ও তাঁর আত্মীয়কুলের যে অভিযোগমালা, তা আসে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মানে কী? প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মানে আমাদের আত্মীয়-বন্ধুর অকালপ্রয়াণ অথবা অঙ্গহানি, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মানে বেসরকারি হাসপাতালের ঘোষিত প্যাকেজের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ। কিন্তু আমি যা প্রত্যক্ষ করি সেটা যে গাফিলতিরই প্রমাণ, এটা নিশ্চিত ভাবে বলা চলে কি? কারণ গাফিলতি হল চিকিৎসা পদ্ধতিতে নিহিত একটি বিষয়, কিন্তু আমি যা প্রত্যক্ষ করি তা হল এই পদ্ধতির পরিণাম। সমস্যাটা জটিল, কারণ চিকিৎসা পদ্ধতি ও তার পরিণামের সম্পর্কটি সম্ভাব্যতা তত্ত্ব মেনে চলে। সব কিছু ঠিক ঠিক করার পরেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। রোগীর আত্মীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিতে চিকিৎসা পদ্ধতির ঠিক-ভুল পুরোটাই তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানভিত্তিক মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-ও হতে পারে।

একই যুক্তি চিকিৎসার প্যাকেজ-বহির্ভূত খরচ নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ধরা যাক আপনি একটি অস্ত্রোপচার করাবেন বলে ভর্তি হলেন, যার ঘোষিত প্যাকেজ এক লক্ষ টাকা। হাসপাতাল ছাড়ার সময় বিল গিয়ে দাঁড়াল পাঁচ লক্ষ। এই বাড়তি খরচ যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার নার্সিংহোম চক্রের জন্য হতে পারে, আবার অস্ত্রোপচার চলাকালীন কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্যও হতে পারে। তাই শুধুমাত্র মৃত্যু বা বাড়তি খরচ দেখেই এককথায় বলে দেওয়া যায় না সেটা চিকিৎসকের ভুল। তা হলে এই বিচারের উপায় কী?

Advertisement

এই ধরনের বিচারের চিরাচরিত উপায় মেডিক্যাল কাউন্সিল, যেখানে বিচারকের ভূমিকায় থাকেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, সেখানে গিয়ে খুব সহজে কেউ বিচার পেয়েছেন এমন নয়। পুরো পদ্ধতিটি খুবই সময় ও খরচসাপেক্ষ। এই পরিস্থিতিতে বাজার কি কোনও সমাধান দিতে পারে?

অর্থনীতির তত্ত্ব বলে, কেউ সৎ আচরণ করবেন না অসৎ, তা নির্ভর করে সৎপথে থাকার আর্থিক পুরস্কার বেশি না অসৎ পথে থাকার। জোরালো আইন আনা মানে শাস্তির পরিমাণ বা শাস্তিপ্রদানের সম্ভাব্যতা বাড়িয়ে দেওয়া, যা অসৎ পথে থাকার আর্থিক পুরস্কার কমিয়ে দেবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, আদালতের মাধ্যমে বস্তুভিত্তিক ও নিরপেক্ষ শাস্তিপ্রদান সহজ নয়। অন্য অনেক দোষ থাকলেও বাজারের সুবিধে হল বাজার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত। তাই বাজারও যদি অসৎ পথে থাকার আর্থিক পুরস্কার কমিয়ে দিতে পারে তা হলে অনেক কম সামাজিক ব্যয়েই লক্ষ্যসিদ্ধি হতে পারে।

বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটা বড় অভিযোগ হল, কোনও অস্ত্রোপচারের পরে প্যাকেজে ঘোষিত মূল্যের থেকে অনেক বেশি টাকা ধার্য করা। বেসরকারি হাসপাতালের বক্তব্য হল, অনেক সময় অস্ত্রোপচার চলাকালীন কোনও নতুন সমস্যা উদ্ভব হওয়া যা আগে জানা ছিল না। যেমন, জরায়ুর কোনও অপারেশন করতে গিয়ে টিউমার ধরা পড়া, বা কোনও ওষুধের কোনও মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়া। এই সব নতুন সমস্যা মোকাবিলার জন্য নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়, যা চিকিৎসার খরচ অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়, যা আগে জানানো সম্ভব নয়। বেসরকারি হাসপাতালের এই দাবি সত্যি হতেই পারে, আবার এটা বেশি টাকা রোজগারের জন্য ডাক্তার-হাসপাতালের চক্রান্তও হতে পারে। এই ধরনের অভিযোগের বিশেষজ্ঞ দিয়ে তদন্ত করানোই নিয়ম। কিন্তু সে পদ্ধতি সময় ও খরচসাপেক্ষ।

এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিকে এক ধরনের দুর্ঘটনা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। দুর্ঘটনার বাজারি সমাধান হল বিমা। এ ক্ষেত্রেও আমরা এক ধরনের বিমার কথা ভাবতে পারি। যে কোনও অস্ত্রোপচার করানোর আগে আলাদা ভাবে এই বিমা কিনতে হবে, যার প্রিমিয়াম সাধারণ স্বাস্থ্য বিমার থেকে আলাদা হবে। এই বিমা কেনা থাকলে অস্ত্রোপচার চলাকালীন কোনও অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হলে তার খরচ পাওয়া যাবে।

বিমাতেও সমস্যাটা পুরো কাটছে না। কারণ ডাক্তার জানেন রোগীর অস্ত্রোপচার চলাকালীন বিশেষ কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, রোগীর আত্মীয়রা কিন্তু জানেন না। কোনও অসৎ ডাক্তার বা নার্সিংহোম চাইলে এই ধরনের পরিস্থিতি কাজে লাগাতেই পারে অনাবশ্যক চিকিৎসা করিয়ে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রস্তাবিত বিমার দ্বিতীয় ভাগ। বিমার প্রিমিয়াম হবে ডাক্তার-নার্সিংহোম ভিত্তিক। অর্থাৎ, বিমার প্রিমিয়াম দিতে হবে অস্ত্রোপচার হওয়ার আগে এবং ডাক্তার ও নার্সিংহোম ভেদে প্রিমিয়াম পাল্টে যাবে। অর্থাৎ আপনি যদি ডাক্তার ক-এর কাছে নার্সিংহোম ১-এ চিকিৎসা করান তা হলে যা প্রিমিয়াম দিতে হবে, সেটি ডাক্তার খ-এর কাছে নার্সিংহোম ২-তে চিকিৎসার প্রিমিয়াম এর থেকে আলাদা হবে। এই ব্যবস্থার সুবিধা কী? শুরুতে সবার জন্যই প্রিমিয়াম একই রাখতে হবে কারণ আমাদের কাছে কোনও ডাক্তার-নার্সিংহোম সমন্বয় বেশি খরচ করায় তার কোনও তথ্য নেই। কিন্তু যত দিন যাবে বিমার প্রিমিয়াম দেখেই বলে দেওয়া যাবে কোন ডাক্তার-নার্সিংহোম সমন্বয়ে প্যাকেজ বহির্ভূত খরচের সম্ভাবনা বেশি। যে ডাক্তার-হাসপাতাল সৎ, তাঁদের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে এ রকম আপৎকালীন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা খুব নিয়মিত হবে না। অন্য দিকে অসৎ ডাক্তার-হাসপাতালের ক্ষেত্রে এ রকম পরিস্থিতি বার বার দেখা দেবে। প্রস্তাবিত বিমাতে সৎ ডাক্তার-হাসপাতাল সমন্বয়ে চিকিৎসার এই আপৎকালীন বিমার প্রিমিয়াম কম এবং অসৎ ডাক্তার-হাসপাতাল সমন্বয়ে এই প্রিমিয়াম বেশি হবে। সুতরাং সেই প্রিমিয়ামের মাত্রা দেখে বোঝা যাবে কোন ডাক্তার-হাসপাতাল সৎ আর কে অসৎ। রোগীরা স্বভাবতই বেশি প্রিমিয়ামের হাসপাতাল এড়িয়ে চলবেন আর এই ব্যবসার ক্ষতির চাপই অনৈতিক ডাক্তার-হাসপাতালদের নীতির পথে নিয়ে আসবে। চিকিৎসায় গাফিলতিতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এই বিমা কার্যকর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিমাটি হবে জীবনবিমার মতো— রোগী মারা গেলে টাকা পাওয়া যাবে। এখানেও ঝুঁকিপূর্ণ ডাক্তার-হাসপাতাল সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম বেশি হবে, যা রোগীকে এই ধরনের ডাক্তার-হাসপাতালকে এড়িয়ে চলতে সাহায্য করবে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক

Advertisement