E-Paper

অ-সুস্থ

বিরোধীরা দাবি তুলতে পারতেন, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই জম্মু ও কাশ্মীরেও একটি সংখ্যালঘু কমিশন হওয়া দরকার, যাতে এই অঞ্চলের ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দুদের শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগসুবিধা বা সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৬

জনস্মৃতি ক্ষণস্থায়ী, তবু এই মুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ২০১৫-য় জম্মু ও কাশ্মীরের সুশীল সমাজ পথে নেমেছিল এ অঞ্চলে একটি এমস-এর দাবিতে। ২০২৬-এর জানুয়ারিতে সেই জম্মুই দেখল, সমাজের একটি অংশ পথে নেমে, ঢাকঢোল বাজিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে— কাটরার একটি মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ হয়ে গেল বলে। মা কী ‘ছিলেন’ আর এই এক দশকে কী ‘হইয়াছেন’ সেই বিশ্লেষণ জরুরি নিশ্চয়ই। তবে তারও আগে পালন করা দরকার সম্মিলিত নীরবতা ও শোক। আইন না ভেঙে, অসাধু সুযোগ না নিয়ে, মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পেয়েও শুধু মুসলমান বলে যে দেশের মেডিক্যাল কলেজে যোগ্য ছাত্রেরা পড়তে পারলেন না, সেই দেশের অক্ষমতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা। মাত্র পনেরো মিনিটের নোটিসে জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন কলেজ পরিদর্শনে এসে ওই কোর্সের অনুমতি বাতিল করে দিল, এ যে স্রেফ পরিকাঠামোর অপ্রতুলতার জন্য নয়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির কাছে নতিস্বীকার করে— নীতি ও নৈতিকতার এই সার্বিক অধঃপতনের জন্য শোক।

জম্মু ও কাশ্মীরে বিরোধী দল বিজেপি এবং তাদের সহচর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির কাছে যে মেডিক্যাল কলেজে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের সুযোগ পাওয়ার ঘটনাও ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ জিগির তোলার সুযোগ করে দেবে, এ আশ্চর্য নয়। বিজেপি-আরএসএস’এর কাছে বরং এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু শাসক দলই বা কী করল? মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে এত রাজনীতি হলে সেই কলেজের প্রয়োজন নেই, এই ছাত্রছাত্রীদের অন্য মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হবে— মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার এই বিবৃতিই বুঝিয়ে দেয় এখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাল: মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়াও তাঁরা মেনে নেবেন, কিন্তু নিজেদের নীতিগত ব্যর্থতাকে স্বীকার করবেন না। কেউ উচ্চকণ্ঠে বললেন না, একটি মেডিক্যাল কলেজে কোন ধর্মের কত ছাত্র পড়বে সেটা ধর্তব্যই নয়— ৫০টির মধ্যে ৪২টি সিটে মুসলমান ছাত্রেরা সুযোগ পেয়েছিলেন নিজেদের মেধার জোরেই, তা থেকে তাঁদের বঞ্চিত করা অবৈধ, বেআইনি, অসাংবিধানিক। বিরোধীরা দাবি তুলতে পারতেন, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই জম্মু ও কাশ্মীরেও একটি সংখ্যালঘু কমিশন হওয়া দরকার, যাতে এই অঞ্চলের ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দুদের শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগসুবিধা বা সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তার বদলে তাঁরা বেছে নিলেন উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির পথটিই। শাসক ও বিরোধী, কোনও তরফেই কোনও মধ্যম পন্থার চেষ্টাটুকুও হল না, মাঝখান থেকে বন্ধ হয়ে গেল একটি মেডিক্যাল কলেজ।

এই কাজে কাদের লাভ হল তা স্পষ্ট। কিন্তু কাদের ক্ষতি হল এবং কতটা, কত দূর অবধি, সেটাও স্পষ্ট ভাবে বলা প্রয়োজন। ভৌগোলিক ভাবে প্রত্যন্ত, ধর্মীয় রাজনৈতিক সন্ত্রাসে ত্রস্ত, সামরিক প্রতাপে নাজেহাল জম্মু ও কাশ্মীরে অন্য নানা নাগরিক পরিষেবার মতোই জনস্বাস্থ্যের হাল অত্যন্ত খারাপ; চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, হাসপাতালের চিত্রটি করুণ। জনসংখ্যার অনুপাতে ডাক্তারদের সংখ্যা, সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য ডাক্তারি শিক্ষায় আসন বরাদ্দ— সবই সেখানে খুব কম। এই যেখানে পরিস্থিতি, সেখানে একটি মেডিক্যাল কলেজের গুরুত্ব যারপরনাই: ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার, স্থানীয় কর্মসংস্থান, অর্থনীতি থেকে সার্বিক জনস্বাস্থ্যেও তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সেই সব কিছুর দ্বার রুদ্ধ হল, বিরাট ক্ষতি হল জনস্বার্থের। হিন্দুত্ববাদের কারবারিরা যে তা বুঝেও বুঝবেন না, জানা কথা। কিন্তু তাঁদের সমর্থক-অনুরাগী যে সাধারণ মানুষেরা হিন্দুদের ডিঙিয়ে মুসলমান ছাত্ররা মেডিক্যাল কলেজে পড়তে না পারায়, কিংবা গোটা কলেজটাই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমোদ পেলেন, তাঁদের ভিতরে যে এক গভীর অসুখ বাসা বেঁধেছে, সন্দেহ নেই। এই অসুখের চিকিৎসা কোথায় হবে— কোন মেডিক্যাল কলেজে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

medical college Jammu and Kashmir

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy