E-Paper

ডিজিটাল ডাকাতি

প্রতারণার শিকার যে নাগরিকেরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণের কী হবে? ভারতে এখনও পর্যন্ত ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনাগুলিতে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের উদাহরণ কোটিকে গুটিক; টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না এমন ধারণাই প্রায় সর্বাংশে সত্য প্রমাণিত হয়, পুলিশ-প্রশাসনও ‘নাগরিকের দোষ’ বলে হাত ধুয়ে ফেলে।

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:১৭

২০২১-এর এপ্রিল মাস থেকে ২০২৫-এর নভেম্বর, এই সাড়ে চার বছরের একটু বেশি সময়ে ডিজিটাল প্রতারণার শিকার ভারতীয়রা যত টাকা খুইয়েছেন, তার পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই তথ্য উদ্ধৃত করে সম্প্রতি এই বিরাট আর্থিক প্রতারণাকে ‘ডাকাতি’ বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ। ডাকাতিই বটে, প্রচারমাধ্যম সূত্রে ডিজিটাল প্রতারণার যে ঘটনাগুলি জানা যাচ্ছে তাতে আতঙ্ক জাগতে বাধ্য— ‘কেওয়াইসি আপডেট’-এর ছলে, অথবা ভুয়ো লিংক ও কিউআর কোড-এর মাধ্যমে, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিডিয়ো কলে পুলিশ, গোয়েন্দা, সিবিআই-আধিকারিক সেজে নাগরিককে নানা কায়দায় প্যাঁচে ফেলে আর ভয় দেখিয়ে, ব্যাঙ্কে সঞ্চিত সর্বস্ব হাতিয়ে কেটে পড়ছে দুর্বৃত্তেরা। আধুনিক যুগে, আধুনিকতর প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে হয়ে চলেছে ডিজিটাল ডাকাতি।

এই অপরাধ রুখতে নাগরিকের সতর্কতা প্রয়োজন অবশ্যই, কিন্তু দায় কি শুধু তার একার? শীর্ষ আদালত আঙুল তুলেছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ও তার অধীন ব্যাঙ্কগুলির দিকেও। এই প্রতারণা ডিজিটাল ও ব্যাঙ্ক-নির্ভর, যে ব্যাঙ্কে প্রতারিতের অ্যাকাউন্ট আছে সেখান থেকে সব টাকা নিমেষে চলে যাচ্ছে প্রতারকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে— বড় অঙ্কের তাৎক্ষণিক এই ‘ডিজিটাল ট্রানজ়াকশন’ ব্যাঙ্কের তরফে ধরতে পারা, তৎক্ষণাৎ সেই প্রক্রিয়াটি স্থগিত বা বন্ধ করা এবং গ্রাহককে অবিলম্বে সতর্ক করার ব্যবস্থা কেন ব্যাঙ্কের থাকবে না, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কও এ নিয়ে কেন সক্রিয় নয়, বিচারপতিরা সেই জরুরি ও সঙ্গত প্রশ্ন তুলেছেন। এই সূত্রে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথাও, শীর্ষ আদালত বলেছে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন চিহ্নিত করার কাজে এআই-কে কাজে লাগাতে। ‘মিউল হান্টার’-এর মতো এআই-ভিত্তিক অ্যাপ ব্যাঙ্কগুলির আছে বটে, কিন্তু তার প্রয়োগ ও কার্যকারিতা প্রশ্নাতীত নয়।

এ তো গেল প্রতারণা রোখার সম্ভাব্য পদক্ষেপ। কিন্তু প্রতারণার শিকার যে নাগরিকেরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণের কী হবে? ভারতে এখনও পর্যন্ত ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনাগুলিতে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের উদাহরণ কোটিকে গুটিক; টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না এমন ধারণাই প্রায় সর্বাংশে সত্য প্রমাণিত হয়, পুলিশ-প্রশাসনও ‘নাগরিকের দোষ’ বলে হাত ধুয়ে ফেলে। নাগরিকের বিচার-বিবেচনা নিশ্চয়ই প্রথমত ও শেষ পর্যন্তও জরুরি, কিন্তু মনে রাখতে হবে এই প্রতারণার রূপটি ডিজিটাল ও আগাগোড়া ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোত— দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা যে মোটেই নিশ্ছিদ্র নয়, তারই প্রমাণ। বছরকে বছর এই বিপুল প্রতারণা হয়ে চলা শাসনব্যবস্থার জন্যও অশনিসঙ্কেত— সুপ্রিম কোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককেও বলেছে এ ধরনের ঘটনাকে ‘প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট’ (পিএমএলএ)-র প্রেক্ষিতে বিবেচনা করা হবে কি না তা খতিয়ে দেখতে; রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক ও অন্য আর্থিক এজেন্সিগুলির সঙ্গে একত্রে বসে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর শিকার নাগরিকদের ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে একটি নীতি-কাঠামো তৈরি করতে। এই সব কিছুরই শেষ কথাটি দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার— নাগরিকের পাশাপাশি দায়িত্ব আছে ব্যাঙ্কের, প্রশাসনের, পুলিশের, সরকারের, মোট কথা: রাষ্ট্রেরও। সেই দায় ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াও তো কম প্রতারণা নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Financial Fraud Digital Frauds Cyber Crime

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy