E-Paper

বিরল অধিকার

সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা উদ্যোগী হয়েছে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিহ্নিত করতে, যৌথ ভাবে তারা কাজ করছে ‘অর্গানাইজ়েশন ফর রেয়ার ডিজ়িজ়েস ইন্ডিয়া’ এবং ‘রেয়ার ওয়ারিয়র্স অব বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে।

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:২৭
নাচে-গানে জমজমাট অনুষ্ঠান। মধুসূদন মঞ্চে।

নাচে-গানে জমজমাট অনুষ্ঠান। মধুসূদন মঞ্চে। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

ওদের চলার পথটি মসৃণ নয়। প্রতিকূলতা সামনে এসে দাঁড়ায়, দীর্ঘ দিনের অর্জনকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায়। তবু তারা অদম্য। সম্প্রতি বিশ্ব বিরল রোগ দিবসে কলকাতার এক শিশু হাসপাতাল তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখানেই উপস্থিত ছিল কর্কট রোগ ও বিরল রোগে আক্রান্ত এক ঝাঁক শিশু, নাচ-গানের মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিভাকে তুলে ধরেছিল দর্শকদের সামনে। ‘বিরল রোগ দিবসে বিরল সক্ষমতার উদ্‌যাপন’— এমনই ছিল স্লোগান। যথার্থ স্লোগান। যে যুদ্ধে এক সময় হেরে যাওয়াই নিয়তি ধরে নেওয়া হত, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের উন্নতি এবং আক্রান্তের ইতিবাচক মানসিকতা ও লড়াইয়ের জেদ এখন সেই অসম যুদ্ধের বিরুদ্ধেই হাতিয়ার তুলে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভিমতটি গুরুত্বপূর্ণ— বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুরা কী করতে পারে না, সেটা নয়; তারা কী করতে পারে, সেটা দেখা হোক। একই সুরে বলতে হয়, শুধুমাত্র রোগ-জয়ই নয়, অন্যদের মতো স্বাভাবিকতায় বাঁচা, নিজেদের কুসুম-কোমল প্রতিভাগুলিকে নষ্ট না-হতে দেওয়ার যে শপথ তারা গ্রহণ করেছে, সেই সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানানো হোক।

তাদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেওয়ার প্রয়াসটি প্রশংসার্হ। তবে এই উদ্যোগগুলি যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাস্তব কিন্তু সেই প্রমাণ দেয় না। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা যুক্তদের প্রতিনিয়ত যে বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তার জন্য শুধুমাত্র তাদের শারীরিক, মানসিক অক্ষমতা দায়ী নয়। তার অন্যতম কারণ, সমাজের ‘সুস্থ, স্বাভাবিক’রা প্রায়শই তাদের জগতে এই ‘অন্য’দের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে দেয়। প্রতি বইমেলাতেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ মেলে। কলকাতার বইমেলা আন্তর্জাতিক, অথচ সেখানেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যুক্তদের জন্য স্বচ্ছন্দ চলাচল, পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা যায় না। মেট্রোয় প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ থাকলেও প্রায়শই তা ‘সুস্থ’দের দখলে থাকে। বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিশু অনায়াসে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলার, পড়ার সুযোগ পায় না। কারণ বিদ্যালয়, অভিভাবকদের একাংশ তাদের সেই সুযোগ দিতে অনিচ্ছুক। এই দেওয়ালগুলি ভাঙতে না পারলে সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা অসম্ভব।

প্রশাসনও কি সেই দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করে? সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা উদ্যোগী হয়েছে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিহ্নিত করতে, যৌথ ভাবে তারা কাজ করছে ‘অর্গানাইজ়েশন ফর রেয়ার ডিজ়িজ়েস ইন্ডিয়া’ এবং ‘রেয়ার ওয়ারিয়র্স অব বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে। ‘মাস্কুলার ডিসট্রফি’ আক্রান্তদের মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে রাজ্য। কিন্তু আক্রান্তদের পরিবার জানে, চিকিৎসায় অবিশ্বাস্য ব্যয়ের কথা। দেখা গিয়েছে, জিনঘটিত বিরল রোগে নথিপত্র জমা করার পরও ওষুধ মেলেনি, বর‌ং স্বাস্থ্যকর্মীদের অসংবেদনশীল মন্তব্য জুটেছে। সরকারি বিদ্যালয়ে স্পেশাল এডুকেটর-এর পদটিও হামেশাই খালি থেকে গিয়েছে। বহু আবেদন সত্ত্বেও রাজ্য বাজেটে প্রতিবন্ধীদের ভাতাবৃদ্ধির ঘোষণাও হয়নি। পথেঘাটে, গণপরিবহণে বিশেষ ভাবে সক্ষমদের জন্যই বা কী পদক্ষেপ করা হয়েছে? ২০১৬ সালের প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংক্রান্ত আইন তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন, সমানাধিকার রক্ষা, বৈষম্য না করার কথা বলে। প্রশাসন এবং এই সমাজ তার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rare Diseases Children Health Cultural Program Rare Disease

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy