E-Paper

পাঠশালা বন্ধ

স্কুলগুলিতে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে থাকতে দেওয়ার সমস্যাটি দ্বিবিধ। প্রথমটি দৈনন্দিন পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়ার, বাহিনীর উপস্থিতিতে যে কাজ নির্বিঘ্নে করা সম্ভব নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন এক বিরাট সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা।

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৩

বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভোট নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গের সরকার তাদের সার্বিক কল্যাণ বিষয়ে বিশেষ ভাবিত নয়— এমন অভিযোগ হামেশাই শোনা যায়। অভিযোগটি যে আদৌ মিথ্যা নয়, সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির দৈনন্দিন পঠনপাঠনের অবস্থা, শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত, স্কুলবাড়িগুলির হাল, মিড-ডে মিলের বরাদ্দ, তার প্রমাণ বহন করে। নির্বাচন তাতে আরও এক বাড়তি উপদ্রব স্বরূপ। এই বছর যেমন পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই স্কুলগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর চলে আসার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। ১৫ মার্চের মধ্যেই স্কুলগুলিতে বাহিনীর পৌঁছনোর কথা। অথচ, উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা এখনও বাকি। এপ্রিলের গোড়ায় শুরু হওয়ার কথা স্কুলগুলির প্রথম পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার। সবেতেই আপাতত প্রশ্নচিহ্ন। এই অসুবিধা এক-দু’সপ্তাহে মেটার নয়। নির্বাচন, এবং নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে যে রকম দাঁড়ায়, তাতে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর থেকে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রাজ্যের স্কুলগুলির রয়েছে।

স্কুলগুলিতে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে থাকতে দেওয়ার সমস্যাটি দ্বিবিধ। প্রথমটি দৈনন্দিন পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়ার, বাহিনীর উপস্থিতিতে যে কাজ নির্বিঘ্নে করা সম্ভব নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন এক বিরাট সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা। এই দায়িত্বপূর্ণ কাজের চাপে সহজবোধ্য কারণেই তাঁদের পক্ষে বিদ্যালয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ইতিমধ্যেই প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা। তার জের পুরোপুরি না কাটতেই নির্বাচনের ধাক্কা। সিলেবাস তবে শেষ হবে কোন উপায়ে? উচ্চ মাধ্যমিকের প্র্যাক্টিক্যাল যদিও বা দ্রুত শেষ করা যেতে পারে, পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার কী ব্যবস্থা হবে? না কি সমগ্র নির্বাচন-পর্ব জুড়ে পরীক্ষা-পড়াশোনা সব শিকেয় তুলে বসে থাকাই এ রাজ্যের শিক্ষার্থীদের নিয়তি? অফলাইন ক্লাস বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পরিণতি কোভিডকাল দেখেছে। তার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা। ফের সেই পথে হাঁটার চেষ্টাটি বাস্তবসম্মত হবে কি? সরকারি স্কুলে সমাজের সমস্ত আর্থসামাজিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। ক’জনের পক্ষে সম্ভব ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, মোবাইলের ব্যবস্থা করে শ্রেণিকক্ষের মতো নিয়ম মেনে ক্লাস করা? দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীর যেখানে নিজস্ব একখানা ঘরও জোটে না, সেখানে অন্য ব্যবস্থা দিবাস্বপ্নমাত্র।

দ্বিতীয় সমস্যাটি পরিকাঠামোগত। দীর্ঘ দিন কেন্দ্রীয় বাহিনী অবস্থান করার ফলে বিদ্যালয় চত্বরটি যে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে, সে অভিযোগ শিক্ষকরা বহু বার করেছেন। তদুপরি সামনেই গ্রীষ্মকাল। ফের লম্বা ছুটির অপেক্ষা। অবস্থা বর্তমানে এমন দাঁড়িয়েছে, বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষা দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যাওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে মসৃণ রেখে বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব বহু বার দেওয়া সত্ত্বেও সরকারি স্তরে তেমন ভাবনার ইঙ্গিত মেলেনি। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে রাজ্যের কোর্টে বল ঠেলে দায় ঝেড়ে ফেলেছে, রাজ্য প্রশাসন স্কুলগুলিকে বাহিনী আসার খবর জানিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছে। মাঝখান থেকে অবরুদ্ধ এক বিরাট সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

central forces School students Education system West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy