×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

শ্রদ্ধাহীন

০৭ এপ্রিল ২০২১ ০৫:০২
ফাইল চিত্র।

ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গের এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদী রাজ্য সরকারের আধিকারিকদের উদ্দেশে বলিলেন, যেখানে ভোট হইয়া গিয়াছে, সেখানে কৃষকদের বিষয়ে তথ্যপঞ্জি প্রস্তুত করিয়া রাখুন— বিজেপি সরকার গড়িলেই পিএম কিসান প্রকল্পের কাজ শুরু করিয়া দিবে। জনসভায় নিশ্চয় হাততালির ঝড় উঠিয়াছিল। সমর্থকরা আরও এক বার নিশ্চিত হইয়াছিলেন যে, যিনি কাজের মানুষ, তিনি এই ভাবেই কাজ করেন— এক মুহূর্ত সময় নষ্ট নহে। নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি চালু থাকিবার সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী এই কথাগুলি কী ভাবে বলিতে পারেন, সেই প্রশ্নও অবশ্য উঠিয়াছে। শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা নহেন, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আস্থাবান নাগরিকমাত্রেই উদ্বিগ্ন হইবেন— যাবতীয় শোভনতা, নৈতিকতার গণ্ডি অতিক্রম করিয়া এই আচরণ কি প্রধানমন্ত্রীকে শোভা পায়?

রাজ্য সরকারকে অতিক্রম করিয়া প্রধানমন্ত্রী সরাসরি রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিলে তাহা যে রাজ্যের অধিকারকে লঙ্ঘন করা হয়, এই কথাটি প্রধানমন্ত্রী জানেন না এমন নহে। তিনি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, এবং কেন্দ্রে ছিল ইউপিএ-র সরকার, তখন বহু বার, বহু প্রশ্নে তিনি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের অধিকারের প্রশ্নে সরব হইয়াছেন। ২০০৯ সালে, মুখ্যমন্ত্রীদের কনক্লেভে মোদী প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন এনআইএ গঠনের যৌক্তিকতা লইয়া— বলিয়াছিলেন, কেন্দ্র কি সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার প্রশ্নে রাজ্য সরকারগুলিকে পাশ কাটাইয়া যাইতে চাহে? ২০১২ সালে ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজ়ম সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্কটিকেই ভাঙিয়া দিতে চাহে। সেই বৎসরই ইউপিএ সরকার বিএসএফ আইন সংশোধন করিয়া সেই বাহিনীর অধিকার খানিক বৃদ্ধি করায় নরেন্দ্র মোদী বলিয়াছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকার নাকি রাজ্যের মধ্যে পৃথক রাজ্য (‘স্টেট উইদিন আ স্টেট’) গড়িয়া তুলিতে তৎপর। উদাহরণের তালিকা বৃদ্ধি করিবার প্রয়োজন নাই— গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী জানিতেন যে, কেন্দ্র ও রাজ্যের এক্তিয়ারের যে সীমারেখা আছে, তাহাকে সম্মান করাই যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ধর্ম। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেও যদি কেন্দ্রীয় সরকার নিজের এক্তিয়ার লঙ্ঘন করিয়াছে বলিয়া বোধ হইত, মুখ্যমন্ত্রী মোদী জানিতেন, তাহার প্রতিবাদ করাই সঙ্গত।

প্রধানমন্ত্রী মোদী সেই কথাগুলি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইলেন কী ভাবে? কোনও রাজ্যে কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজটি যে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার তুলনায় গুরুতর হইতে পারে না, তাহা বলিয়া দেওয়ার প্রয়োজন নাই। তবুও, প্রধানমন্ত্রী শুধু সেটুকুর জন্যই যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ধর্মকে অসম্মান করিলেন। কারণ, তিনি নির্বাচনী প্রচার করিতেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা শ্রমিককল্যাণের ন্যায় যে বিষয়গুলি মূলত রাজ্যের অধিকারভুক্ত, তিনি তাহাতেও নিরন্তর হস্তক্ষেপ করিতেছেন। কেন, বর্তমান পরিসরে সেই আলোচনার প্রয়োজন নাই। তবে কেহ বলিতেই পারেন, নরেন্দ্র মোদীর নিকট যুক্তরাষ্ট্রীয়তা, গণতন্ত্র ইত্যাদি কথা আদৌ কোনও অর্থ বহন করে না। তাঁহার রাজনীতির স্বার্থে যখন যেমন ভাবে প্রয়োজন, এই বিষয়গুলিকে তখন তেমন ভাবেই ব্যবহার করেন তিনি। কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকিলে তিনি রাজ্যের সহিত বিশ্বাসের সম্পর্কের কথা বলেন; কিন্তু, যখন কেন্দ্রের শাসক হিসাবে তাঁহাদের দিশা রবির ন্যায় এক তরুণীকে শায়েস্তা করিবার প্রয়োজন পড়ে, তখন এক্তিয়ারের তোয়াক্কা না করিয়াই দিল্লি পুলিশ বেঙ্গালুরুতে গিয়া অপারেশন সারিয়া আসে। দেশের মৌলিক ধর্মের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নাই, ইহার অধিক দুঃসংবাদ আর কী হইতে পারে?

Advertisement
Advertisement