E-Paper

নারী-দ্বেষপ্রেম

লক্ষণীয়, নির্বাচনের পূর্বে উত্তাপ যখন চড়তে থাকে, তখন লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য এক ভিন্ন মাত্রা পায়। কারণ, ভারতের রাজনীতিতে পেশিশক্তির প্রদর্শন এখনও অন্যতম নিয়ন্ত্রক। আর পেশিশক্তির সঙ্গে পুরুষতন্ত্র ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত।

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৭:৩২

ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অকথা-কুকথার স্রোত নতুন কিছু নয়। প্রায়শই তা ধর্ম, বর্ণ, জাতের পাশাপাশি লিঙ্গবৈষম্যের ছবিটিকেও বেআব্রু করে ফেলে। শেষের এই ক্ষেত্রটিতে আবার বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন। সম্প্রতি বিজেপি নেতা প্রলয় পাল কর্তৃক নন্দীগ্রামের পরিযায়ী শ্রমিকদের স্ত্রীদের ‘সতীত্ব’-এর প্রতি কুরুচিকর মন্তব্য এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। শুধুমাত্র কুরুচিকরই নয়, তাঁর মন্তব্যটি অসাংবিধানিকও বটে। যে ভঙ্গিতে তিনি তাঁদের দিঘার হোটেলে ‘দীক্ষা’ নেওয়া, বাড়িতে আসার পর ‘স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া’ প্রভৃতি বিষবাক্য নিক্ষেপ করলেন, তাকে শুধুমাত্র মেয়েদের সম্মানহানি বললে যথার্থ বিশ্লেষণ হয় না। বরং, মেয়েদের প্রতি বৈষম্য না করা, তাঁদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা, স্বাধীন মত প্রকাশ প্রভৃতি সংবিধান-প্রদত্ত অধিকারগুলির মর্যাদাও একই সঙ্গে লঙ্ঘিত হল। তাঁর জেনে রাখা প্রয়োজন, এ দেশের সংবিধানের ৫১ক(ঙ) ধারা বলে— নারীর মর্যাদা নষ্ট করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এক জন রাজনীতিবিদ হিসাবে তো বটেই, এক জন নাগরিক হিসাবেও প্রলয় পালের আচরণটি সেই দায়িত্বজ্ঞানের বিন্দুমাত্র পরিচয় দিল না।

লক্ষণীয়, নির্বাচনের পূর্বে উত্তাপ যখন চড়তে থাকে, তখন লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য এক ভিন্ন মাত্রা পায়। কারণ, ভারতের রাজনীতিতে পেশিশক্তির প্রদর্শন এখনও অন্যতম নিয়ন্ত্রক। আর পেশিশক্তির সঙ্গে পুরুষতন্ত্র ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। গত লোকসভা ভোটের আগে পূর্ব মেদিনীপুরের নির্বাচনী জনসভা থেকে তমলুকের বিজেপি প্রার্থী অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ‘বিক্রি হওয়ার দাম’ নিয়ে প্রশ্ন ছুড়েছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠে আপত্তিজনক সুর খেলিয়ে ‘দিদি ও দিদি’ সম্ভাষণটির ভিতরেও নারীবিদ্বেষের স্বরটি চাপা থাকেনি। অবশ্য যে দল দলিত, সংখ্যালঘু মেয়ের ধর্ষণকারীদের প্রকাশ্যে বরণ করে নেয়, নারী নিগ্রহ, খুনে অভিযুক্তদের নির্বাচনের টিকিট ধরায়, তাদের সদস্যদের এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত নয়। অবাক লাগে যখন এ রাজ্যের শাসক দল, যাদের প্রধানের পদটি অলঙ্কৃত করে রয়েছেন এক জন নারী, তারাও একই পথে পা মেলায়। একদা তৃণমূলের সাংসদ-অভিনেতার ‘ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেব’ বক্তব্য থেকে শুরু করে বাম প্রার্থী দীপ্সিতা ধরের গাত্রবর্ণ নিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষ কিংবা দলেরই মহিলা সাংসদের প্রতি কুরুচিকর মন্তব্য— সেই ধারা আজও বহমান।

দুর্ভাগ্যজনক, সেই ধারাকে বহমান রাখার প্রক্রিয়াটিতে যুক্ত সমাজমাধ্যম এবং মূল ধারায় মিডিয়ার একাংশও। সেই কারণেই নির্বাচনের প্রাক্কালে দলের প্রাক্তন সদস্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আপত্তিজনক মন্তব্য করলে তা-ও প্রচার এবং দর্শকের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে কোন কথাটির কতটুকু প্রকাশ করা প্রয়োজন, কোন কথা বললে অন্যের মর্যাদাহানি হয়, ক্ষুদ্র স্বার্থের প্রয়োজনে সে কথা ভুলতে বসাই যেন এ যুগের দাবি। রাজনীতি তার পথ দেখিয়েছে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটি নিয়েছে মিডিয়ার একাংশ। এমতাবস্থায় নাগরিককেই স্থির করতে হবে, এই অশুভ চিন্তার দোসর তাঁরা হবেন কি না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Harassment BJP Leader BJP West Bengal Politics Nandigram

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy