E-Paper

ফাঁকা ক্লাসঘর

কলেজে ছাত্র ভর্তি হচ্ছে না কেন; যারা নাম লেখাচ্ছে তারাও শেষ অবধি ক্লাসঘরমুখী হচ্ছে না কেন— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ক্লাসঘর বা কলেজের পরিসরে খুঁজলে মিলবে না।

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩৩

— প্রতীকী চিত্র।

এক কালে যে সব কলেজে ভর্তি হতে ছাত্রছাত্রীদের লাইন পড়ত, খাস কলকাতার এমন বহু স্বনামধন্য কলেজে এখন স্নাতক স্তরের ক্লাস ভর্তিই হয় না। অর্থাৎ, মফস‌্‌সলের কলেজ অথবা কলকাতা বা তার শহরতলির অখ্যাত কলেজগুলিতে যে সমস্যা বেশ কিছু বছর ধরেই দানা বাঁধছিল, তা এখন প্রথম সারির কলেজগুলিরও বাস্তব। কেউ বলতে পারেন, আগে যেমন ছাত্রছাত্রীরা এই কলেজগুলিতে ভর্তি হতে চাইত, এখন তারা ভিন রাজ্যের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাড়ি দিচ্ছে। কথাটির সত্যাসত্য অন্যত্র বিচার্য। প্রশ্ন হল, যদি তা-ই হয়, তা হলে তো বাজারের নিয়মেই মেধার দ্বিতীয় ধাপে থাকা ছেলেমেয়েদের ভর্তি হওয়ার কথা সেই প্রথম সারির কলেজগুলিতে— উচ্চশিক্ষার চাহিদা যদি থাকেই, তা হলে আসন খালি পড়ে থাকার তো কথা নয়। অর্থাৎ, অপ্রিয় সত্যটি এ বার স্বীকার করতেই হবে— অখ্যাত ও বিখ্যাত, উভয় গোত্রের কলেজই এখন একই রোগের শিকার। আসন খালি থাকছে, কারণ রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষার চাহিদা কমেছে। এমনকি, এ রাজ্যের সীমিত জোগানের তুলনাতেও চাহিদা কম। তার খানিক দায় কলেজগুলির উপরেও বর্তায়। কলেজে পঠনপাঠনের পরিকাঠামো নেই, লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরি নেই, এমনকি কিছু কিছু কলেজে ক্লাসঘর বা শৌচাগারও নেই। শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে; তার চেয়েও অনেক বড় ঘাটতি রয়েছে বহু শিক্ষকের সদিচ্ছায়। ছাত্র থাকুক অথবা না-ই থাকুক, ক্লাসঘরে কেউ কিছু শিখুক অথবা না-ই শিখুক, চাকরি এবং বেতন যদি নিশ্চিত হয়, তা হলে কারও কারও ক্ষেত্রে সদিচ্ছার এমন অভাব ঘটলে বিস্ময়ের অবকাশ থাকে না।

কিন্তু, কলেজে ছাত্র ভর্তি হচ্ছে না কেন; যারা নাম লেখাচ্ছে তারাও শেষ অবধি ক্লাসঘরমুখী হচ্ছে না কেন— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ক্লাসঘর বা কলেজের পরিসরে খুঁজলে মিলবে না। শুধু আজ বলে নয়, দীর্ঘ দিন ধরেই যত ছেলেমেয়ে উচ্চ শিক্ষার পাঠক্রমে নাম লেখায়, তাদের অতি সামান্য অংশ সে পথে হাঁটে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে— বাকিদের চাহিদা সহজ: লেখাপড়া শিখে একটা ভদ্রস্থ চাকরি জোগাড় করা। চাহিদাটি বাস্তব এবং ন্যায্য। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা ভারতেই এখন উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কটি ক্ষীণ হয়েছে। ডাক্তারি-এঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাইরে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরের উচ্চ শিক্ষার পরে চাকরি মিলবে, এমন প্রত্যাশা ক্রমেই কমেছে। তার একটি কারণ, এই স্তরের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাজারের চাহিদার বিন্দুমাত্র সাযুজ্য নেই। ফলে, কলেজ পাশ করলেও ছেলেমেয়েদের মধ্যে এমপ্লয়েবিলিটি বা নিয়োগযোগ্যতা তৈরি হয় না। গত কয়েক বছরে চাকরির জগৎ অতি দ্রুত গতিতে পাল্টেছে। কলেজ-পাঠ্যক্রম তার সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টাই করেনি। কিন্তু আরও বড় কারণ হল, উচ্চ শিক্ষার পরে সংগঠিত ক্ষেত্রে হোয়াইট কলার চাকরি পাওয়ার বাস্তবটিই অতীত হয়ে গিয়েছে। কারণ, অর্থনীতির স্বাস্থ্যভঙ্গে তেমন চাকরির সংখ্যা প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে গিগ ইকনমি। একটি মোবাইল ফোন আর একটি মোটরবাইক থাকলেই যে কাজ করা সম্ভব— তার জন্য কেউ উচ্চ শিক্ষার পরিশ্রম করবে কেন? কলেজের ফাঁকা ক্লাসঘরগুলিতে এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

College Students College admission Education system West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy