E-Paper

এক প্রার্থীর তন্ত্র

পশ্চিমবঙ্গে ভোট সমাপ্ত, এ বার গণনা ও রায়ের অপেক্ষা। এই অবকাশে বলা জরুরি যে, দেশের যে প্রান্তেই গণতন্ত্রের অবমাননা ঘটুক, শাসকের রং-নির্বিশেষে তা অন্যায়। পুর-পঞ্চায়েত স্তরে বিজেপি-শাসিত রাজ্যেও তা অন্যায়, পশ্চিমবঙ্গেও।

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৭:৫১

ধরা যাক, কোনও একটি রাজ্যে পুর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাতশোরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করলেন রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। ঘটনাটির মধ্যে উদ্বেগের কোনও কারণ আছে কি? ক্ষমতাসীন দলটির নাম কী, সে প্রশ্নের উত্তর যত ক্ষণ না জানা যায়, তত ক্ষণ অবধি বলা যাবে না যে, এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন হওয়া বিধেয়, না কি উল্লসিত। এই ঘটনা যদি পশ্চিমবঙ্গের মতো বিরোধী-শাসিত রাজ্যে ঘটে, তবে তা গভীর উদ্বেগের কারণ— রাজ্যে শাসক দল এমনই আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে, নির্বাচন আয়োজনই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কিন্তু, গণতন্ত্র তত ক্ষণই ‘খতরে মে হ্যায়’, যত ক্ষণ কোনও রাজ্যে বিজেপি-বিরোধী দল ক্ষমতাসীন। শাসনের কুর্সির রং পাল্টে গৈরিক হয়ে যাওয়ামাত্র সব বিপন্নতা উধাও। উল্লিখিত ঘটনাটি ঘটেছে বিজেপি-শাসিত গুজরাতে। সে রাজ্যের সাম্প্রতিক পুর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে। তার পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল বলেছেন, পরিস্থিতি এমনই হওয়া প্রয়োজন, যাতে শাসক দলের বিরুদ্ধে একটি মনোনয়নও জমা না পড়ে। কিন্তু, এই ঘটনা, বা মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণ হিসাবে গণ্য করলে চলবে না— একে দেখতে হবে শাসক দলের পক্ষে জনসমর্থনের অকাট্য প্রমাণ হিসাবে। এর আগেও সুরাত লোকসভা কেন্দ্রে বিরোধী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল এবং অন্যদের সরে দাঁড়ানোর পরে বিনা ভোটে বিজেপি জয়ী হয়েছিল। তারও আগে গুজরাতের স্থানীয় নির্বাচনে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা কঠিন। গণতন্ত্রের অভাব বলা— কঠিনতর। কারণ, রাজ্যে শাসকের কুর্সিতে যে দল আসীন, তারাই স্থির করে দেয়, দেশে কোথায় গণতন্ত্র আছে, আর কোথায় নেই।

এমন ঘটনা শুধু গুজরাতেই ঘটে, বললে অন্য রাজ্যের প্রতি অন্যায় হবে। চণ্ডীগড় মেয়র নির্বাচনে ব্যালট বিকৃতির অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল; আদালত একে ‘গণতন্ত্রের প্রহসন’ বলেছিল। ত্রিপুরার পুরভোটে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা, হিংসা, এবং বিপুল সংখ্যক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিযোগ উঠেছিল। উত্তরপ্রদেশে পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শারীরিক বাধা— কিছুই বাকি ছিল না। মধ্যপ্রদেশে ভোটার তালিকায় বিপুল অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল। হরিয়ানায় ভুয়ো ভোটার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মণিপুরে পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছিল বুথ দখল ও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগে। কিন্তু, মনে রাখতে হবে যে, এ দেশের বিরোধী-শাসিত রাজ্যে যখন এমন অভিযোগ গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রমাণ, বিজেপি-শাসিত রাজ্যে যে কোনও সংগঠিত অনিয়ম কিন্তু আসলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন! যে-হেতু বিজেপির সেরা রাজনৈতিক সাফল্য হল দেশে রাজনৈতিক আখ্যানের উপরে প্রশ্নাতীত নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা— কোন ঘটনাটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তা স্থির করে বিজেপির ভাষ্য। পশ্চিমবঙ্গে যা ‘রিগিং’, গুজরাতে তা-ই ‘জনাদেশ’।

পশ্চিমবঙ্গে ভোট সমাপ্ত, এ বার গণনা ও রায়ের অপেক্ষা। এই অবকাশে বলা জরুরি যে, দেশের যে প্রান্তেই গণতন্ত্রের অবমাননা ঘটুক, শাসকের রং-নির্বিশেষে তা অন্যায়। পুর-পঞ্চায়েত স্তরে বিজেপি-শাসিত রাজ্যেও তা অন্যায়, পশ্চিমবঙ্গেও। প্রসঙ্গত, বিধানসভা-লোকসভা ভোটে কিন্তু নিরপেক্ষ নির্বাচন করানোর সাংবিধানিক দায়িত্বটি ন্যস্ত নির্বাচন কমিশনের উপরে। পশ্চিমবঙ্গে গত কিছু বারের মতো ভোটে রাজনৈতিক বাধার আশঙ্কায় কমিশন এ বার আধা-সামরিক বাহিনীতে রাজ্য মুড়ে ফেলেছে। তেমন তৎপরতা সাম্প্রতিক অতীতে অন্য রাজ্যেও চোখে পড়েছে কি? ত্রিপুরায়, কিংবা হরিয়ানায়? পড়লে অন্তত এ কথা বলার উপায় থাকত না যে, প্রতিষ্ঠানটি তার সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা যমুনার কালো জলে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু না, সেই আস্থার পথটি এই ভারতে আর খোলা নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

vote counting West Bengal Politics West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy