E-Paper

স্বার্থের খাতিরে

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইরানের জন্য এটি আরব সাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভারতের ক্ষেত্রে এটি পাকিস্তানের গদর বন্দরের বিপরীতে অবস্থিত, যা চিনের বিনিয়োগে নির্মিত।

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৭:৫৭

পশ্চিম এশিয়ার অস্থির আবহের মাঝে পুনরায় চাপের মুখে ভারত। কারণ, চাবাহার বন্দর। চাবাহারের বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা বরাবরই ইরানের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার অস্থায়ী ছাড়ের উপর নির্ভরশীল ছিল। গত মাসের শেষে ছাড়ের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় এবং বর্তমান যুদ্ধের আবহে তা পুনর্নবীকরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকায়, ভারতের হাতে বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়েছে। সম্ভবত, এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এ বছরের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য কোনও অর্থই বরাদ্দ করা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, জানা গিয়েছে, ভারত ইতিমধ্যেই শহিদ বেহেশতি টার্মিনালে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে এবং বেশিরভাগ দৈনন্দিন কাজ ইরানি কর্মীদের হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিস্থিতি যা, তাতে ভারতের এই বন্দরের আংশিক মালিকানা থেকে সরে আসার সম্ভাবনাই প্রবল। এমনটা হলে মধ্য এশিয়ায় আয়নি বিমানঘাঁটির মতোই পশ্চিম এশিয়াতেও একটি কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হাতছাড়া হবে ভারতের।

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইরানের জন্য এটি আরব সাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভারতের ক্ষেত্রে এটি পাকিস্তানের গদর বন্দরের বিপরীতে অবস্থিত, যা চিনের বিনিয়োগে নির্মিত। এর ফলে এটি এমন একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যা পশ্চিম ভারত মহাসাগরে চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ কার্যক্রমের পরিপূরক অথবা প্রতিযোগী হতে পারে। তা ছাড়া, এই বন্দর পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় সরাসরি প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি, এটি ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (আইএনএসটিসি)-এর সঙ্গেও যুক্ত, যার লক্ষ্য ভারতকে ইউরোপ ও রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করা। এমতাবস্থায়, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে বন্দর প্রকল্পটি পরিত্যাগ করার অর্থ হল, শুধু আফগানিস্তানের সঙ্গেই নয়, বৃহত্তর মধ্য এশীয় অঞ্চলের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগ বিসর্জন দিতে হবে ভারতকে। তা ছাড়া, এই উদ্যোগে ইরান ধারাবাহিক ভাবে ভারতকে সমর্থন করে আসছে। চাবাহার হাতছাড়া হলে ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হতে পারে। সমস্যা রয়েছে আরও। চাবাহারের পতনে গদর তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে চিনের ভূমিকা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এই পরিণাম আঞ্চলিক ভারসাম্যকে এক নতুন রূপ দিতে পারে, যা দিল্লি কখনও চাইবে না।

অনেকের মতেই, ভারতের বর্তমান নীতি প্রয়োজনের তাগিদেই বেশি গঠিত। আমেরিকা-ইরান সম্পর্কে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় এবং ওয়াশিংটন তেহরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখায়, নয়াদিল্লিকে তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ সাবধানে রক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু দিল্লির ভোলা উচিত নয়, একটি শক্তিশালী ইরান-ভারত অংশীদারি ভারতকে শুধু তার বাণিজ্যের অগ্রগতি, আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং শক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই সাহায্য করবে না, পশ্চিম এশিয়ায় প্রধান শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করবে। এমতাবস্থায় চাবাহার বন্দর প্রকল্পটি বজায় রাখতে, ভারতকে অবশ্যই তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ইরানের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। দেশের স্বার্থ যেখানে জড়িয়ে, সেখানে কোনও আপস চলে কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Chabahar Port India-Iran Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy