E-Paper

যুদ্ধবিশ্বে পাখির বাসা

প্রথম আক্রমণের দিন নয়, যুদ্ধ শুরু হয় তার প্রস্তুতির সূচনাপর্ব থেকে। অস্ত্রশিল্প, সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সামরিক মহড়া— গোটা যুদ্ধযন্ত্রই বিপুল জ্বালানি, খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে।

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:৪৩

মানুষে-মানুষে যুদ্ধ চলছে, সে খবর পাখির কাছে পৌঁছয় কি না, কে জানে! কিন্তু, তার ঘরেও নির্ভুল ভাবে পৌঁছে যায় যুদ্ধের উপকরণ। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে এক পাখির বাসার খোঁজ পেলেন বিজ্ঞানীরা, যা তৈরি করতে পাখিটি ব্যবহার করেছে হামলাকারী ড্রোনে ব্যবহৃত ফাইবার অপটিক তার। পাখিটি আক্ষরিক অর্থেই ঠোঁটে বয়ে যুদ্ধকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছে। অবশ্য, শুধু এই একটি ক্ষেত্রেই নয়, দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছে গিয়েছে পরিবেশে, বাস্তুতন্ত্রে— মেরামতের অযোগ্য ক্ষতি হয়ে চলেছে এই ভঙ্গুর বিশ্বের, মানুষের লোভ যাকে ইতিমধ্যেই সহ্যের শেষ সীমায় ঠেলে দিয়েছে। অথচ, যুদ্ধের অভিঘাত মাপতে এখনও পুরনো অঙ্কই কষে গোটা দুনিয়া— হতাহতের হিসাব, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, ভূখণ্ড দখল ইত্যাদি। যুদ্ধকে এখনও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সংঘর্ষ হিসাবেই দেখা হয়। বাস্তবে তা আর নেই। আজকের যুদ্ধ নদীর বিরুদ্ধে, অরণ্যের বিরুদ্ধে, কৃষিজমির বিরুদ্ধে, সমুদ্রের বিরুদ্ধে। গাজ়ায় জল সরবরাহ ব্যবস্থা, নিকাশি পরিকাঠামো এবং কৃষিজমির ধ্বংস; ইউক্রেনে বিস্তীর্ণ ও সমৃদ্ধ কৃষিভূমি ও অরণ্যের প্রবল দূষণ এবং বিস্ফোরকে ভরে যাওয়া ভূখণ্ড— সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতি আর যুদ্ধের ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ নয়; প্রকৃতিও যুদ্ধক্ষেত্রের অংশ। এই পরিবর্তনটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখনও স্বীকার করেনি। যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা এখনও মানুষের প্রত্যক্ষ ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য প্রকৃতির ক্ষতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে যে আলোচনা হয়, সেখানে পরিবেশ এখনও কার্যত অনুপস্থিত।

প্রথম আক্রমণের দিন নয়, যুদ্ধ শুরু হয় তার প্রস্তুতির সূচনাপর্ব থেকে। অস্ত্রশিল্প, সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সামরিক মহড়া— গোটা যুদ্ধযন্ত্রই বিপুল জ্বালানি, খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলিই মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সাড়ে পাঁচ শতাংশের জন্য দায়ী। যুদ্ধ শুরু হলে সেই চাপ বহু গুণ বেড়ে যায়। খনিজ তেল উত্তোলনের বিপুল এলাকা জ্বলে, রাসায়নিক কারখানা ধ্বংস হয়, কৃষিজমি দূষিত হয়, অরণ্য নিশ্চিহ্ন হয়, নদী বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সে বিষ মিশতে থাকে হাওয়ায়, জলে। যুদ্ধ শেষ হলেও সেই ধ্বংস শেষ হয় না। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে; কিন্তু দূষিত ভূগর্ভস্থ জলকে কোনও শান্তিচুক্তি বিশুদ্ধ করতে পারে না। অস্ত্রবিরতি ঘোষণা হতে পারে; কিন্তু মাটিতে মিশে যাওয়া ভারী ধাতু বা বিস্ফোরকের বিষক্রিয়া তার নির্দেশ মানে না। একটি পরিণত অরণ্য কয়েক ঘণ্টায় পুড়ে যেতে পারে; তাকে ফিরে পেতে লাগে বেশ কয়েক দশক। যুদ্ধের রাজনৈতিক আয়ু কয়েক মাস, বড় জোর কয়েক বছর— কিন্তু তার পরিবেশগত আয়ু কয়েক প্রজন্ম। এক প্রজন্মের যুদ্ধের দায় বহন করতে হয় পরবর্তী প্রজন্মকে। হয়তো তার পরের প্রজন্মকেও। হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক বিস্ফোরণ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ, কারণ গোটা দুনিয়ার সৌভাগ্য যে, তার পরের আট দশকে কোনও দেশ আর এই অস্ত্র ব্যবহার করেনি। কিন্তু, সেই বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয়তার দায় যে ভাবে বইতে হয়েছিল পরবর্তী প্রজন্মকে, যুদ্ধে পরিবেশের ক্ষতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তেমন দায়ই রেখে যাচ্ছে।

গত শতাব্দীতে মানবসভ্যতা যুদ্ধের মধ্যেও কিছু সীমারেখা টেনেছে। হাসপাতাল, যুদ্ধবন্দি, সাধারণ নাগরিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— এদের সুরক্ষা আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু পরিবেশ এখনও সেই নৈতিক সুরক্ষার বাইরে। যেন বনভূমি, নদী, সমুদ্র কিংবা বায়ুমণ্ডল যুদ্ধের বৈধ লক্ষ্য হতে পারে। একুশ শতকের সিকি ভাগ অতিক্রম করে এ কথা স্বীকার করার সময় এসেছে যে, প্রকৃতি কোনও রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়; মানবসভ্যতার অস্তিত্বের ভিত্তি। একটি দেশের যুদ্ধ থেকে নিঃসৃত কার্বন গোটা পৃথিবীর জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। দূষিত নদী সীমান্ত মানে না, সমুদ্র কোনও পতাকার অধীন নয়। যে পৃথিবীকে রক্ষা করার নামে রাষ্ট্রগুলি অস্ত্র হাতে নেয়, যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সেই পৃথিবীকেই তারা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন করে। এই আত্মঘাতী বৈপরীত্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত। যুদ্ধের আইনকে যেমন এক দিন মানবিক হতে হয়েছিল, তেমনই আজ তাকে পরিবেশ-সংবেদনশীলও হতে হবে। কারণ, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়তো রাষ্ট্রগুলির মধ্যে নয়— সে যুদ্ধ সমগ্র মানবজাতি ও প্রকৃতির মধ্যে। তাতে মানুষের পরাজয় সংশয়াতীত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

War Destruction Environmental Movements Environmental awareness

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy