E-Paper

স্ববিরোধিতার দেশ

এর পিছনে ছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আতিশয্য, এবং সুবিপুল সামরিক শক্তিসংগ্রহ— যা অন্যান্য দেশের কল্পনাতীত।

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৮

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সার্ধদ্বিশতবর্ষে একটি প্রশ্ন সঙ্গত ভাবেই উঠতে পারে। এ কি কেবল দেশটির একার জন্যই ঐতিহাসিক মুহূর্ত? না কি সমগ্র বিশ্বের জন্যও ঐতিহাসিক? আড়াইশো বছরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এক পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জময় বিশ্বের মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে, একটি পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জ-নিমজ্জিত বিশ্বও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নামক দেশের সামনাসামনি হয়েছে। দুই দিক থেকেই ঘটনাটি গুরুতর। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ‘ফাউন্ডিং ফাদার’রা বলেছিলেন, আমেরিকা নিজের মতো করেই বাঁচুক, বিশ্বের অন্যত্র কী হচ্ছে সে বিষয়ে তার বেশি নাক না গলানোই ভাল। এই ছিল ‘আইসোলেশনিজ়ম’ বা নিজের মতো পথে চলার উপদেশ। অথচ দেখা গেল, প্রায় প্রথম থেকেই বিশ্বমঞ্চে সে ক্রমে এক ভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হল, যাকে ‘আইসোলেশনিস্ট’ বা একাকী যাত্রী বলা চলে না। অন্যান্য মহাদেশে প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবিস্তার করেনি আমেরিকা, অন্তত খাতায় কলমে করতে পারেনি। তবে প্রথম থেকেই বিস্তীর্ণ মহাদেশ জুড়ে ‘সেটলার-কলোনিস্ট’ বা উপনিবেশবাদী ক্ষমতাবিস্তারী হিসাবে নিজ পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে। শুধু উত্তর আমেরিকা নয়, মধ্য আমেরিকাতেও, পার্শ্ববর্তী ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জেও। অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদের এক আলাদা মডেল তৈরি করে ফেলেছিল তারা, বলা যায়। বিশ শতকে তা এক ভিন্ন রূপে ছড়াতে শুরু করে বহির্বিশ্বেও।

সন্দেহ নেই, বিশ শতকের দু’টি বিশ্বযুদ্ধেই আমেরিকার ভূমিকাটি একেবারে কেন্দ্রীয়। এর পিছনে ছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আতিশয্য, এবং সুবিপুল সামরিক শক্তিসংগ্রহ— যা অন্যান্য দেশের কল্পনাতীত। আর ছিল এক অদম্য রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের ক্রমাগত বিস্ফোরণ, যা বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে আমেরিকা-সফররত রবীন্দ্রনাথ অভ্রান্ত ভাবে দেখতে পেয়েছিলেন, এবং কতিপয় অবিস্মরণীয় বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা ন্যাশনালিজ়ম বলে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। বিশ-একুশ শতকের বিশ্বের প্রবল জাতীয়তাবাদী অভিযাত্রারও প্রধান উৎস আমেরিকা। আজও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা অবশিষ্ট বিশ্বের অনুপ্রেরণাস্বরূপ। যে ধনতন্ত্রের অদম্য বিকাশ এই জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণের প্রধান হেতু, তার সংগঠনকে কোন উত্তুঙ্গ স্তরে নিয়ে গিয়ে মানব-ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আমেরিকাই তা দেখিয়েছে।

একই সঙ্গে, আমেরিকা ভূখণ্ডের অসামান্য মিশ্র সংস্কৃতির ফসল হিসাবে, গত আড়াই শতক জুড়ে উদারবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রধান প্রচারকও আমেরিকা। আঠারো শতকের জাতির পিতারা বলেছিলেন আমেরিকার দু’টি লক্ষ্য: বিস্তার বা ‘এক্সপ্যানশন’ ও মুক্তি বা ‘ইম্যানসিপেশন’। আমেরিকা যে ভাবে এই দুই লক্ষ্যে এগিয়েছে, তার মধ্যে এক বিরাট স্ববিরোধিতা আছে, নিজের বিস্তারের লক্ষ্যে অন্যের মুক্তির বিলোপের প্রয়াস আছে। বিশ্বযুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, ইরাক-ইরান এবং প্যালেস্টাইন, সমস্ত ঘটনাই তার প্রমাণ। ইতিহাসের পরিহাস— আড়াইশো বছরের উদ্‌যাপনের মুহূর্তে এক দিকে আমেরিকা গণতন্ত্রের মহিমা প্রচার ও অন্য দিকে আমেরিকা ও তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ইজ়রায়েলের আগ্রাসনে পশ্চিম এশিয়ার বিধ্বস্ত ছবি। অথচ এই আমেরিকাই শোষণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সুদূরপ্রসারী তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রতিরোধের আলোও দেখিয়েছে। বর্ণবিদ্বেষের বিলোপের জন্য বিদ্রোহ ঘটেছে, কৃষ্ণাঙ্গ দেশনেতা ক্ষমতায় এসেছেন। আজ দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে জর্জরিত, ইসলামবিদ্বেষে সমাচ্ছন্ন বিশ্বেও কিন্তু আমেরিকাতেই সম্ভব হয়েছে ‘আইকনিক’ নিউ ইয়র্ক শহরে এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলমান মেয়রের ক্ষমতালাভ। এই সব স্ববিরোধিতা আজও আমেরিকাকে একটি বিশিষ্ট ও একক দেশ করে রেখেছে। এই আশ্চর্য ঐতিহাসিক গতিরেখাই বুঝিয়ে দেয়— বিশ্ব-মানচিত্রে সব দেশই কখনও না কখনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে, তবে কারও কারও গুরুত্ব প্রথমাবধি অখণ্ডনীয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Donald Trump USA america

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy