E-Paper

সারা দিন বাড়িতে কী করো?

পরিবারের রোজগারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মেয়েদের অদৃশ্য শ্রম। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই শ্রমকে মান্যতা দিল। বলল, সংসার নয় মেয়েরা জাতির নির্মাতা।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৫

ছবি: সায়ন্তন দত্ত।

সারা দিন বাড়িতে কী করো? এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে মেয়েদের দিন কাটে। ক্লাস এইট পাশ মেয়েই হোক আর পিএইচডি করা মেয়ে, কেউ সংসারের শত কোটি ছোট-বড় কাজকে ‘কাজ’ বলে দেখিয়ে উঠতে পারে না। উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও বলে, ‘আমি কিছু করি না, বাড়িতে থাকি।’ সরকারি ফর্মে ‘পেশা’-র খোপে লেখেন ‘হাউসওয়াইফ’— গৃহবধূ। ইংরেজি জানা যে মেয়েরা লেখেন ‘হোমমেকার’— সংসার রচয়িতা, শেষ অবধি আর্থিক সঙ্গতির খোপে লিখতেই হয় ‘ডিপেন্ডেন্ট’— নির্ভরশীল।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির একটি রায় এই ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি কোটিশ্বর সিংহ বলেছেন, রোজগেরে সদস্যদের উপরে ‘নির্ভরশীল’ (ডিপেন্ডেন্ট) হিসেবে দেখা হয় মেয়েদের। অথচ, আসল ছবিটা ঠিক উল্টো। পরিবারের রোজগেরে সদস্যরাই মেয়েদের বেতনহীন গৃহশ্রমের উপরে নির্ভরশীল। এ কথা যে কতখানি সত্যি, কে না জানে‍! মেয়েটি সংসারের ঊনকোটি চৌষট্টি কাজ করে বলেই না অফিসবাবুরা সময় মতো পেট ভরে খেয়ে কাজে যায়, আবার ফিরে এসে গরম জলখাবার, রাতের সুখাদ্য পায়! ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বৃদ্ধের শুশ্রূষা করে কারা? পাশাপাশি অগণিত মেয়ে বিনামূল্যের শ্রম দেয় পরিবারের আর্থিক উদ্যোগেও— কেউ দোকানে বসে, কেউ ব্যবসার কাজে বসে, কেউ কাজ করে খেতখামারে। পরিবারের রোজগারের মধ্যে ঢুকে থাকে তাদেরও শ্রম, কিন্তু সবটাই অদৃশ্য হয়ে। মেয়েদের শ্রমের মূল্য চোখে দেখা যায় না, তাই সেটি সহজেই ‘নেই’ করে দেওয়া চলে। কোনটা ‘অমূল্য’ আর কোনটা ‘মূল্যহীন’, তার বিচার নির্ভর করে মানুষের দেখার শক্তি, দেখার ক্ষমতার উপরে। মেয়েদের প্রতি ন্যায় করা, সম্মান করার ইচ্ছের উপরে। রোজগেরে পুরুষের উপরে পরিবারের মেয়েটির আর্থিক নির্ভরতার জন্য পুরুষ মনে করে, মেয়েটির গোটা জীবনটাই তার ইচ্ছার অধীন। সেই মেয়েদের উপরে পুরুষদের যে কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া চলে।

ছবি: সায়ন্তন দত্ত।

সুপ্রিম কোর্টের রায়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তা মনে করিয়েছে যে, সংসারের জন্য মেয়েদের শ্রম বস্তুত অমূল্য। মেয়েরা কেবল তার সংসারই তৈরি করে না, দেশকেও নির্মাণ করে। কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে টাকার অঙ্কে শ্রমের অবদান নির্ণয় করা দরকার হয়ে ওঠে। গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত এক বধূর পরিবারকে কত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, তা বিচার করে সুপ্রিম কোর্ট জানাল, বেতনহীন গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা। এত দিন অবধি এই ধরনের মামলায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময়ে গৃহকাজের মূল্য মাসে তিন হাজার টাকার মধ্যেই সীমিত রাখত বিভিন্ন ট্রাইবুনাল এবং আদালত। সুপ্রিম কোর্টে এসেছিল যে মামলাটি, সেটির ক্ষেত্রেও তার আগে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট মাসে তিন হাজার টাকার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ধার্য করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই অঙ্ককে এক লাফে দশ গুণ বাড়িয়েছে, এবং অতঃপর ক্ষতিপূরণের মামলায় মাসে ৩০ হাজার টাকাকেই গৃহকাজের মূল্য বলে ধরার নির্দেশ দিয়েছে।

অনেক মেয়ে হয়তো এ কথা শুনে তেতো হাসি হাসবে। সংসারের কাজের মূল্য আদালত যা-ই ধার্য করুক না কেন— তিন হাজার টাকা, ৩০ হাজার টাকা বা তিন লক্ষ টাকা, বেঁচে থাকতে মেয়েটার হাতে তো কেউ তিন পয়সাও দিচ্ছে না! অনেক মেয়ে নিজেদের গৃহশ্রমের মূল্য হিসেব করাটাই অপছন্দ করে। গৃহিণী নিজের সংসারের কর্ত্রী, তাকে আবার টাকা দেবে কে, আর সে নেবেই বা কেন? কথাগুলো একেবারেই যথার্থ, মেয়েদের গৃহশ্রমের দাম নির্ধারণ হল ‘নোশনাল’— একটি ধারণা-ভিত্তিক অঙ্ক। তার উদ্দেশ্য মেয়েটির গৃহশ্রমের পারিশ্রমিক নির্ধারণ নয়, উদ্দেশ্য হল দেশের কাছে, সমাজ-সংসারের কাছে মেয়েটির শ্রমের গুরুত্বকে তুলে ধরা। অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা সেই জন্যই দেশের অর্থনীতিতে গৃহশ্রমের অবদান দেখাতে নানা অঙ্ক তুলে ধরেন। বাস্তবে ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি-র অঙ্ক নির্ধারণ করার সময়ে মেয়েদের বেতনহীন শ্রমকে ধরা হয় না। তবুও ওই মূল্য কত হতে পারে, তার একটা আন্দাজ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নীতি আয়োগের মতে, বেতনহীন গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য জিডিপি-র ১৫-১৭ শতাংশ, যা জিডিপি-তে কৃষির অবদানের কাছাকাছি। এই রায় সমাজ, সংসারকে মনে করাতে চায় যে, সংসারের জন্য মেয়েদের শারীরিক, মানসিক এবং আবেগের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া চাই। অর্থনীতির দৃষ্টিতে, সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিতে তা মূল্যবান। গৃহকর্মে নিরত মেয়েদের ‘বেকার’ বলে মনে করা যেমন ভুল, তেমনই অন্যায়। বিভিন্ন জাতীয় সমীক্ষায় মেয়েদের ‘কর্মহীন’ বলে দেখানো হয়, তা বন্ধ হওয়া দরকার।

ছবি: সায়ন্তন দত্ত।

শীর্ষ আদালতের এই রায় বিশেষ বার্তা বহন করে সরকারের প্রতিও। দেশের উন্নয়নে যাদের এই বিপুল অবদান, সেই অদৃশ্য মহিলা-শ্রমবাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যয় করতে হবে দেশের সম্পদ। মেয়েদের গৃহশ্রম লাঘব করার জন্য নানা সহায়ক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা দরকার। যেমন, শিশুদের জন্য ক্রেশ, হস্টেল, বৃদ্ধদের জন্য ‘ডে কেয়ার সেন্টার’, সুলভে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা প্রভৃতি। প্রতিটি ঘরে পানীয় জল ও বিদ্যুতের সংযোগ, স্বাস্থ্যসম্মত জ্বালানি, পয়ঃপ্রণালী... এগুলি মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত করবে। এগুলি কেবল সরকারি প্রকল্পের ‘টার্গেট’ পূরণ করার বিষয় নয়, ভোটের আগে জনমোহিনী নীতিও নয়। এগুলি হল অর্থনীতিতে মেয়েদের অবদানের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিদান। আজও যদি মেয়েদের কাঠ কুড়িয়ে রান্না করতে হয়, যদি শিশুর দেখাশোনা করতে গিয়ে তাকে কলেজ বা চাকরি ছাড়তে হয়, তা হলে বুঝতে হবে যে তা মেয়েটির দুর্ভাগ্য নয়, রাষ্ট্রের অকৃতজ্ঞতা।

সংসারের কাজের মূল্যকে স্বীকৃতি দিলেও, আদালত কিন্তু এ কথা বলেনি যে গৃহশ্রমই মেয়েদের জন্য ‘স্বাভাবিক।’ মনে রাখতে হবে, ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ পেলে একটি মেয়ে হয়তো সংসারে তিরিশ হাজার টাকারও বেশি রোজগার করে এনে দিতে পারত। সাংসারিক কাজের চক্করে বাঁধা পড়ে সেই সুযোগ সে হারাচ্ছে। সেই ক্ষতির মাপ কেবল টাকার অঙ্কে হয় না। বিয়ের পরে যারা চাকরি ছেড়েছে, লেখাপড়া ছেড়েছে, নাচ-গান, খেলাধুলো ছেড়েছে, তারা যদি সে সব না ছাড়ত, তবে কী দিতে পারত সমাজকে, কী পরিপূর্ণতা পেতে পারত নিজে, তা কে বলতে পারে? তাই সংসারের কাজকে সম্মান করলেও, সরকারের কর্তব্য গৃহশ্রম লাঘব করা। সময়ের চাইতে মূল্যবান কিছু নেই। সংসারের কাজে দিনে কমবেশি পাঁচ ঘণ্টা দিতে হয় মেয়েদের। সেই সময় কমিয়ে এনে, মেয়েদের হাতে স্বাধীন সময় তুলে দেওয়াই হোক দেশের লক্ষ্য।


ছবি: সায়ন্তন দত্ত,

মডেল: অনন্যা গুহ, ঐক্য পাল,

মেকআপ ও হেয়ার: দীপক শাহ,

স্টাইলিং: প্রলয় দাশগুপ্ত,

পোশাক: অনুশ্রী মলহোত্র,

লোকেশন ও হসপিটালিটি: এনএক্স এলিট, বাইপাস

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

housewife homemaker Domestic Work

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy