পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্র মাত্র— কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের এই বিবৃতিতে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। ওঠারই কথা— বিশেষত যখন ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র ঠিক কী, তার উত্তরে ভারতবাসী এতকাল যা-যা জানতেন, কার্যকালে পেশও করতেন, তার অনেকগুলিই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের আমলে কাঠগড়ায় উঠেছে। নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসেবে প্যান কার্ডের গুরুত্ব কমেছে; কেন্দ্রেরই তৎপরতায় সামনে এসেছে আধার কার্ড, সাম্প্রতিক কালে রাজ্যে রাজ্যে এসআইআর-পর্বে ভোটার কার্ড নিয়েও কম জল ঘোলা হয়নি। বাকি ছিল পাসপোর্ট— বিদেশে ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে যার গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা সর্বাধিক। তা কি এই কারণেই নয় যে, ভারতীয় পাসপোর্ট দেওয়া হয় শুধু ভারতীয় নাগরিকদেরই, এবং তা দেয় কেন্দ্রীয় সরকারই— আবেদনকারীর নথি খতিয়ে দেখে, পুলিশি যাচাইয়ের পর? এত কিছুর পরেও সরকার পাসপোর্টকে স্রেফ ‘বিদেশভ্রমণের নথি’ বলে দাগিয়ে দিলে নাগরিকেরা বিভ্রান্ত হতে বাধ্য। পাসপোর্টের সঙ্গে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও; কোন দেশের পাসপোর্ট কত শক্তিশালী, প্রতি বছর ‘গ্লোবাল পাসপোর্ট পাওয়ার র্যাঙ্কিং’-এ তা জানা যায়। পাসপোর্টের এই ‘ক্ষমতা’ যে প্রদানকারী দেশটির কূটনীতি, অর্থনীতি, বৈশ্বিক প্রভাবের জোরে, স্রেফ তার বিদেশভ্রমণের সুবিধার জন্য নয়, ভারত সরকারেরও তা নিশ্চিত ভাবেই জানা।
বিদেশ মন্ত্রকের ব্যাখ্যায়, পাসপোর্ট নাগরিকত্বের আইনি শংসাপত্র নয়। পাসপোর্টধারীও পাসপোর্টের আসল মালিক নন, খাতায় কলমে তা ভারত সরকারের সম্পত্তি, এমন কথাও পাসপোর্টেই লেখা থাকে। এখানেই প্রশ্ন জাগে, ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি তবে কী? প্যান কার্ড শুধুই নাগরিকের আয়ব্যয়ের হিসাবের নথি, আধার কার্ড কেবলই নাগরিকের পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণ— এই কি শেষ কথা? এসআইআর-এর প্রেক্ষিতে সম্প্রতি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, ভোটার-তালিকায় কারও নাম না থাকলেই তিনি নাগরিকত্ব হারিয়েছেন এমন মনে করার কারণ নেই। এই যুক্তিতে ভোটার কার্ডও নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নয়। এক দিকে দৈনন্দিন নানা সরকারি পরিষেবা বা সুবিধা পেতে এই নথিগুলিই সরকারের দ্বারা গৃহীত ও স্বীকৃত হচ্ছে, অন্য দিকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে সরকারি বিবৃতিতে সেগুলি ঘিরেই সংশয় জাগছে— এই পরিস্থিতি শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, অভাবনীয়ও। ঘরের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, যে ভারতীয়রা বিদেশে আছেন, তাঁদের বসবাস বা কাজকর্মের ভিত্তিই হল ভারতীয় নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট যার মূর্তিমান প্রমাণ। ভারতের সরকারই তাকে নাগরিকত্বের নথি বলে মানছে না, জানলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলির মনোভাব কী হবে?
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে, সরকারি বয়ানেই এই সত্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, নাগরিকের পরিচয় ও নাগরিকত্ব এক জিনিস নয়। সেই কারণেই আধার, ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট— সবই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি হলেও সরকার ও তার আইনের চোখে প্রতিটির উদ্দেশ্য আলাদা, এবং সরকারই ক্রমাগত সেই ফারাক বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত। এখানেই এসে পড়ে আরও জরুরি প্রশ্নটি: নাগরিকের নাগরিকত্ব কি স্বাভাবিক এক অধিকার নয়, অন্য সব সরকারি সুযোগসুবিধার মতোই নাগরিকত্বও কি যোগ্যতাসাপেক্ষে ‘অর্জন’ করার, ক্রমাগত পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার ব্যাপার? কে নাগরিক হবেন, কী ভাবে ও কোন পথে— তার জন্য রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকছে না, নাগরিকের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পেতেও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে, এবং কোনও অন্যথা হলে তার জবাবদিহির দায়ও এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের উপরেই। পাসপোর্টের আইনি সংজ্ঞা ও শর্তাবলি মেনে নিয়েও এই সংশয় প্রকাশ অমূলক হবে না— নাগরিকত্বের ধারণা এতে আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)