E-Paper

জ্বলন্ত

ইউরোপের জলবায়ু নীতিও প্রসঙ্গত উল্লেখ্য। ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘নেট জ়িরো এমিশন’-এর লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নীতিগত ক্ষেত্রে তার অন্যতম পথ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস করা।

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৮

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ— ইউরোপকে সম্প্রতি এমন আখ্যাই দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইউরোপের গ্রীষ্মের তীব্রতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে। এই বছরও রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা, তাপজনিত কারণে তেরোশোর বেশি মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি ইউরোপীয় গ্রীষ্মের সেই চিরাচরিত ফুরফুরে আনন্দযাপনের মুহূর্তগুলিকে উধাও করে দিয়েছে। তার জায়গা নিচ্ছে এক আপৎকালীন পরিস্থিতি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে বিচিত্র সব দৃশ্য— রোদে রেখে দেওয়া পাত্রে ভেজে নেওয়া যাচ্ছে ডিম, বেকন। গলে যাওয়া লাইনের কারণে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ট্রাম চলাচল, গলে যাচ্ছে গাড়ির টায়ার, জুতো, রাস্তার আস্তরণ। স্বস্তি খুঁজতে বার্লিন পুলিশ জলকামান দিয়ে নাগরিক পরিসরে স্নানের ব্যবস্থা করছে।

এই চিত্র গভীর উদ্বেগবহনকারী। সাম্প্রতিক নানা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, বিশ্ব উষ্ণায়ন এক অবিশ্বাস্য গতিতে তার লক্ষ্মণরেখাটি পার করতে উদ্‌গ্রীব। ইউরোপ প্রকৃতার্থেই তার ‘জ্বলন্ত’ প্রমাণ। যে দেশগুলি এত কাল ‘শীতপ্রধান’ হিসাবেই পরিচিতি পেয়েছে, সেখানে চল্লিশ ডিগ্রির দাবদাহের সঙ্গে লড়াই করার কাজটি সহজ নয়। ইউরোপের গ্রীষ্ম পরিস্থিতি ভারতের চেয়ে আলাদা। যে তাপমাত্রায় ভারতে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে বিশেষ প্রভাব পড়ে না, তার চেয়ে কম তাপমাত্রাতেও ইউরোপে মৃত এবং অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কারণটি অনেকাংশে পরিকাঠামোগত, নীতিগতও। ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলিতে বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই নির্মিত হয়েছে দীর্ঘ, তীব্র শীত এবং আরামদায়ক তাপমাত্রাযুক্ত গ্রীষ্মকে মাথায় রেখে, যেখানে তাপ ধরে রাখা যায়। অন্যত্র, গ্রীষ্মের মোকাবিলার জন্য পুরু দেওয়াল, পর্যাপ্ত হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা, হালকা রং ইত্যাদি যথেষ্ট বলে এত কাল বিশ্বাস করে আসা হয়েছে। ফলে, গৃহস্থের বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার সুলভ নয়। এমতাবস্থায় বাইরের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠছে। ফ্রান্সের মতো দেশে তাপজনিত কারণে মৃত্যুর একটি বড় অংশ প্রবীণ নাগরিকরা, যাঁদের দিনের অনেকটা সময় বাড়ির মধ্যেই কাটে।

ইউরোপের জলবায়ু নীতিও প্রসঙ্গত উল্লেখ্য। ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘নেট জ়িরো এমিশন’-এর লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নীতিগত ক্ষেত্রে তার অন্যতম পথ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস করা। এমতাবস্থায় ব্যাপক ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অনুমোদন দেওয়ার অর্থ— এক দিকে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, সেই হেতু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, যা উষ্ণায়নের অন্যতম অনুঘটক, এবং অন্য দিকে, এসি-র দ্বারা ভিতরের অতিরিক্ত তাপকে বাইরে নিষ্কাশনের মাধ্যমে শহরগুলিকে উষ্ণতর করে তোলা, যে চিত্র ইতিপূর্বে ভারতের বড় শহরগুলিতে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, আগামী দিনে ইউরোপে এ-হেন তাপপ্রবাহ তীব্রতর হবে, শীত-গ্রীষ্মের চেনা ছন্দটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। এক দিকে নাগরিক স্বস্তি, অন্য দিকে উষ্ণায়ন প্রতিরোধে স্বীয় প্রতিশ্রুতি পালন— ভারসাম্য রক্ষায় কোন পথ নেবে ইউরোপ, চোখ থাকবে বিশ্বের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Europe Heatwave Alert Heatwave Global Warming

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy