E-Paper

লেলিহান

সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতায় যে অগ্নিকাণ্ডগুলি সংঘটিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে এই একই অভিযোগ ছিল। অ-নিয়মের, দুর্ঘটনার অ-প্রস্তুতির। বহু মানুষ জীবন দিয়ে তার মূল্য চুকিয়েছেন।

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৬:২১

পিছনে জ্বলছে তিনতলা ভবন। দোতলা থেকে কেউ মরিয়া লাফ দিচ্ছেন প্রাণ বাঁচাতে, কেউ কার্নিস ধরে ঝুলে থাকতে গিয়ে হাত ফস্কে নীচে পড়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব লখনউয়ের আলিগঞ্জে কোচিং সেন্টারের অগ্নিকাণ্ডের পর এমনই সব ভয়ঙ্কর ভিডিয়ো প্রকাশ পেয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫ জন, অধিকাংশই শিক্ষার্থী। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রে পাওয়া তথ্যগুলি চমকপ্রদ। খাতায়-কলমে ভবনটি আবাসিক ভবন হিসাবে অনুমোদিত। কিন্তু বাস্তবে তাতে কোচিং সেন্টার ও বাণিজ্যিক কাজকর্ম চলছিল। একদা ভবনটিতে বেআইনি নির্মাণেরও অভিযোগ উঠেছিল। জারি হয় ভেঙে ফেলার নোটিস। কিন্তু পরবর্তী কালে সেই নোটিস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ত্রুটি আরও বহুবিধ। তিনতলা ভবন থেকে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বেরোনোর কোনও পথ ছিল না। অভিযোগ, ছাদে যাওয়ার পথটিও ছিল বন্ধ। ফলে, আগুন ছড়িয়ে পড়লেও শিক্ষার্থীরা পালানোর সুযোগ পাননি। এমনকি, ভিতরে ঢোকার জন্য দেওয়াল ভাঙতে হয় উদ্ধারকারী দলকে, কারণ প্রবেশের উপযুক্ত পথ ছিল না।

এই ছবিগুলি খুব অ-স্বাভাবিক নয়। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতায় যে অগ্নিকাণ্ডগুলি সংঘটিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে এই একই অভিযোগ ছিল। অ-নিয়মের, দুর্ঘটনার অ-প্রস্তুতির। বহু মানুষ জীবন দিয়ে তার মূল্য চুকিয়েছেন। কী ভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, তার কারণ নিয়ে তদন্ত চলবে। গ্রেফতারিও হবে। ইতিমধ্যে সে খবরও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এত বড় ঘটনার পিছনে যে পরোক্ষ প্রশ্রয় ছিল, সেগুলিও যথাযথ তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কেন এতগুলি নিয়ম অমান্য করে এত দিন ধরে সেই কোচিং সেন্টার চলছিল? বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ ওঠার পরেও নোটিস প্রত্যাহার করে নেওয়া হল কার অঙ্গুলি নির্দেশে? এতগুলি মানুষের নিত্য যাতায়াত যেখানে, সেখানে ন্যূনতম নজরদারির ব্যবস্থা কেন ছিল না? অগ্নিকাণ্ডের পর অতি দ্রুত ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করে দিলেই যথেষ্ট সরকারি কর্তব্য পালন করা হয় না। বরং নিরপেক্ষ ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করে সকলকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে অন্য পরিবারগুলির উপর এমন বিপর্যয় নেমে না আসে।

একই সঙ্গে, গোটা দেশে যে কোচিং সেন্টারগুলি যত্র তত্র গজিয়ে উঠেছে, সেগুলির বিষয়ে অবিলম্বে কঠোর হতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে। বছর দুয়েক আগে প্রবল বৃষ্টিতে দিল্লির এক আইএএস কোচিং সেন্টারের বেসমেন্টে জল ঢুকে মৃত্যু হয়েছিল তিন পড়ুয়ার। যে বেসমেন্টে শুধুমাত্র গাড়ির পার্কিং এবং জিনিসপত্র গুদামজাত করার অনুমতি ছিল, সেখানেই লাইব্রেরি তৈরি করেছিলেন কোচিং কর্তৃপক্ষ, যেখানে দুর্ঘটনার দিন বহু পড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, বিভ্রান্তিমূলক বিজ্ঞাপন প্রভৃতি নানা অভিযোগেও নাম জড়িয়েছে বহু কোচিং সেন্টারের। দেশের অগণিত শিক্ষার্থী, কর্মপ্রার্থী এই কোচিং সেন্টারগুলির নির্ভরশীল। অথচ, এগুলির উপর কার্যত কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি কিছুই নেই। এই অব্যবস্থা এখনই বন্ধ হওয়া জরুরি। নবীন প্রজন্মের এক বিরাট অংশের ভবিষ্যৎ প্রশ্নটি যার সঙ্গে জড়িয়ে, সে ক্ষেত্রে কোনও আপস নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Fire Accident Lucknow police investigation Illegal Constructions Coaching Centres

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy