কেবল অনুদানে বৃদ্ধিই নয়, মেয়েদের কাজকেও যে বাজেটে গুরুত্ব দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নবাগত বিজেপি সরকার, তা নিঃসন্দেহে আশা জাগায়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ, যা পশ্চিমবঙ্গ এই প্রথম দেখল। সব ধরনের চাকরিতে এবং সব বর্গের (সাধারণ, ওবিসি, তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি) জন্য এই সংরক্ষণ নিয়ে নীতিগত আপত্তি উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ অধিকাংশ রাজ্যে এখন উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিএ-বি এসসি পাঠরতদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। তা সত্ত্বেও কেন তাদের জন্য চাকরির সংরক্ষণ করা হচ্ছে? রাজনীতির নিরিখে বিষয়টি নিয়ে তর্কের বিশেষ অবকাশ নেই— বিহার, মধ্যপ্রদেশ-সহ অনেক রাজ্য বহু আগেই ৩৩ শতাংশ বা তারও বেশি সরকারি চাকরি মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত করেছে। বেতনহীন গার্হস্থ শ্রমের চাপ, পরিবার ও সমাজের অনুশাসন, কর্মক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য ও হেনস্থার কারণে উচ্চশিক্ষিত মেয়েরাও সহজে কাজে যোগ দিতে চান না। রাজ্যে যত মেয়ে কর্মপ্রার্থী, তার তুলনায় সংরক্ষিত পদ সামান্য হলেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত সমাজের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা। অন্য দিকে, গ্রামের শ্রমজীবী মেয়েদের কাছে মনরেগা এবং ভিবি-জিরাম-জি চালু হওয়ার ঘোষণা দীর্ঘ খরার পর মেঘ-দর্শনের মতো। যদি বাস্তবিক নিয়মিত গ্রামে সরকারি প্রকল্পের কাজ মেলে, পাশাপাশি অন্নপূর্ণা যোজনা-র তিন হাজার টাকা পৌঁছয় শ্রমজীবী মেয়েদের হাতে, তা হলে গ্রামীণ অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়োজিত মেয়েদের মজুরি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে যথেষ্ট, যে-হেতু বিড়ি বাঁধা, তাঁত বোনা, জরি, এমব্রয়ডারি প্রভৃতি কাজের মজুরিতে মন্দা কাটেনি কোভিড লকডাউনের পর থেকে।
তবু ‘জেন্ডার বাজেট’-এ প্রদর্শিত টাকার (১ লক্ষ ৩৭ হাজার কোটি) বড় অংশটাই গিয়েছে অনুদানে— কেবল অন্নপূর্ণা যোজনা এবং লক্ষ্মীর ভান্ডার মিলিয়েই দাঁড়ায় ৪৫ শতাংশ (৬২,৭০০ কোটি টাকা)। টাকার অঙ্ক কম হলেও আশ্বস্ত করে পরিকাঠামো গঠনের ঘোষণাগুলি— মেয়েদের জন্য ১৮১ হেল্পলাইন নম্বর ও আপৎকালীন পরিষেবা চালু, বিনামূল্যে সরকারি বাসে যাত্রার সুযোগ, ভ্রাম্যমাণ মহিলা পুলিশ বাহিনী নির্মাণ, রাজ্যের রিজ়ার্ভ ফোর্স-এ মহিলা পুলিশদের দু’টি ব্যাটালিয়ন তৈরির সিদ্ধান্ত। নতুন ছাত্রী আবাস, নতুন মহিলা কলেজ নির্মাণ, সব স্কুল ও কলেজে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানো— এমন ঘোষণায় চমৎকারিত্ব নেই, তবে ছোট ছোট সমস্যার প্রতি নজর অনেক ক্ষেত্রে বড় সমস্যার মোকাবিলায় সহায়তা করে। অপ্রাপ্তি অঙ্গনওয়াড়িতে। এই পরিষেবা মহিলা ও শিশুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু এ রাজ্যে কেন্দ্রগুলি দীর্ঘ দিন বরাদ্দ-বঞ্চিত। এ বার ১ লক্ষ ২৮ হাজার কেন্দ্রের উন্নয়নের জন্য ধার্য হয়েছে মাত্র ৩৭ কোটি টাকা। আরও আক্ষেপ, অনেকগুলি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সূচনা হলেও, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে ক্রেশ চালু করার ‘পালনা’ প্রকল্প সম্পর্কে বাজেট নীরব। অথচ, শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘পালনা’।
আক্ষেপ রয়েছে কিছু অ-পরিবর্তনের। অঙ্গনওয়াড়ি-কর্মী ও আশাকর্মীদের বেতন এক লাফে পাঁচ হাজার টাকা বাড়াল নতুন সরকার। নিঃসন্দেহে তা স্বস্তিকর। কিন্তু তৃণমূল সরকারের মতো, বিজেপি সরকারও কোনও নির্দিষ্ট বেতনকাঠামো ঘোষণা করল না। ফলে বেতনবৃদ্ধি হয়ে রইল সরকারের ইচ্ছা-নির্ভর। সরকারি-কর্মী হিসেবে ‘স্কিম কর্মী’-দের স্বীকৃতি, সবেতন ছুটি, প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতি দাবিগুলি উপেক্ষিতই রইল। বেতনে বৃদ্ধির পরেও মিড-ডে মিল কর্মীদের দৈনিক প্রাপ্তি ন্যূনতম মজুরিতে পৌঁছল না। তাতে কেবল ওই কর্মীরাই বঞ্চিত হলেন, এমন নয়। সরকার মেয়েদের শ্রমের ঠিক মূল্য দিতে অস্বীকার করলে নিয়োগকর্তাদের কাছে যে বার্তা যায়, তা সব মেয়েকেই বিপন্ন করে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)