E-Paper

দেখার চোখ

নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা জীববিজ্ঞানের নানা মৌলিক বিষয় ইতিমধ্যেই পড়ে। শিল্প, ইতিহাস ও মানবদেহের সম্পর্কের আলোচনাও তাই তাদের শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ হওয়া উচিত।

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ০৮:০৭

সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রতীক মহেঞ্জোদরোর নর্তকী-মূর্তি। এনসিইআরটি-র নবম শ্রেণির চারুকলার পাঠ্যবইটিতে ৪,৫০০ বছর পুরনো এই মূর্তির অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গটিকে ডিজিটাল কৌশলে আংশিক ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে, ইতিহাসবিদ, শিল্পবোদ্ধাদের তীব্র আপত্তির পর বইতে মূল ছবি ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিহাসকে সম্মান জানানোর এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই স্বস্তিদায়ক। তবে, উদ্বেগ শেষ হয় না, কারণ মূর্তিটিকে নিয়ে সমস্যা নতুন নয়। ১৯৯৭-এ দিল্লি পর্যটন বিভাগের ডায়েরিতে ছবিটি ছাপা নিয়ে বাধা এসেছিল। ২০১৭-য় একটি গবেষণাপত্রে একে দেবী পার্বতী আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা হয়। ২০২৩-এ ইন্টারন্যাশনাল মিউজ়িয়ম এক্সপো-র ম্যাসকট হিসাবে এই নর্তকীর একটি ভিন্ন রূপ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে তাকে পোশাক পরিহিতা ও শ্বেতাঙ্গী রূপে উপস্থাপনা করা হয়েছিল। এই ‘শ্বেতীকরণ’ বা অধুনা ‘শুদ্ধিকরণ’-এর প্রয়াসগুলির মধ্যে একটি যোগসূত্র মেলে। এ যেন প্রাচীন শিল্পকে বর্তমান নৈতিকতার ছাঁচে ফেলার চেষ্টা, অতীতকে পছন্দসই ভাবে সাজিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা ইতিহাসচর্চার পক্ষে বিপজ্জনক।

নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা জীববিজ্ঞানের নানা মৌলিক বিষয় ইতিমধ্যেই পড়ে। শিল্প, ইতিহাস ও মানবদেহের সম্পর্কের আলোচনাও তাই তাদের শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ হওয়া উচিত। তা ছাড়া, বহু কাল ধরেই অনুরূপ শিল্পকর্ম ছোটরা দেখেছে এবং তার ফলে সমাজে নৈতিক বিপর্যয় এসেছে, সেই দাবি তোলা যায় না। বরং, এমন সংশোধনীর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের নারীশরীর নিয়ে অস্বস্তি ও নীতিপুলিশির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। বস্তুত, এই নর্তকী-মূর্তি, খাজুরাহোর মন্দির ভাস্কর্য, চোল যুগের ব্রোঞ্জমূর্তি— নিজ নিজ সময়ের প্রতিভূ। এগুলির সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নন্দনতত্ত্বের ধারণা সম্পৃক্ত। এগুলিকে বাদ দিতে গেলে অতীতের সমাজ বিষয়ে জানার কাজটিই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পাঠ্যবইয়ের কাজই হল সত্যকে দেখাতে শেখানো, প্রশ্ন করতে শেখানো। শরীর সম্পর্কে সম্মান, ব্যক্তিগত পরিসর ও সম্মতির ধারণা, নৈতিক শিক্ষা মূল্যবোধ শিক্ষা বা জীবনদক্ষতা পাঠেরই অংশ। ইতিহাস বা চারুকলার কোনও অধ্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা যদি শিল্পের প্রকৃত রূপই না দেখতে পায়, তবে তাদের দেখার চোখ তৈরি হবে কী ভাবে? শিল্পপাঠের শিক্ষা এখনও ভারতে তুলনায় স্বল্পালোচিত। ছবি ঢেকে নয়, প্রয়োজনে আনুষঙ্গিক তথ্যভান্ডার জুড়ে একটি ভাস্কর্যকে কী ভাবে দেখা উচিত, তার ভঙ্গি, উপাদান, রূপক বিশ্লেষণের প্রশিক্ষণ, সে সময়ের পোশাক বা শিল্পরীতির ব্যাখ্যা দেওয়া শিক্ষকেরই কাজ।

ভারতের প্রাচীন শিল্পকলা কখনওই শরীরকে শুধুই কামনার বস্তু হিসাবে তুলে ধরেনি। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী শৃঙ্গার রস কিন্তু অশ্লীলতার সঙ্গে সমার্থক নয়। তা সৌন্দর্য, প্রাণশক্তি, সৃষ্টির প্রকাশ রূপেও বন্দিত। ভারতের মন্দিরভাস্কর্য ও মানবদেহের শিল্পিত উপস্থাপনাকে ঘিরে যে কুণ্ঠা, তার অনেকটাই ভিক্টোরীয় সমাজ-উৎসারিত গোঁড়ামির দান। তাই, ইতিহাসবিদ মিশেল ড্যানিনোর সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলা যায় দেহ নিয়ে এত সঙ্কোচ, তাকে ঢেকে রাখার এই বাড়তি তাগিদ ঔপনিবেশিকতারই রেশ কি না তা ভেবে দেখা জরুরি। এক দিকে স্বদেশির অভিযান, অন্য দিকে ভারতের নিজস্ব শিল্প-ঐতিহ্যকে এ ভাবে সংশোধন বা পুনর্নির্মাণের ভাবনাটি সম্পূর্ণত স্ববিরোধী।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

indus Teaching Method

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy