E-Paper

ঘনীভূত

সঙ্কটের মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় শহরই গড়ে উঠেছে যথেচ্ছ ভাবে। যত মানুষ সেখানে বাস করছেন, নগর পরিকাঠামো সে তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ০৭:৫৩

এক দিকে প্রবল তাপ, অন্য দিকে সুতীব্র জলসঙ্কট— ভারতের অনেকগুলি শহর এখন এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ। ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গিয়েছে; শুকিয়ে গিয়েছে জলাশয়। ফলে, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই— গাঙ্গেয় অববাহিকার বাইরে অবস্থিত দেশের প্রায় সব বড় শহরেরই এক অবস্থা। নেহাত ভৌগোলিক অবস্থানের কল্যাণে কলকাতার সঙ্কট এখনও ততখানি তীব্র নয়; তবে এই শহর ও তার শহরতলিতেও জলসঙ্কটের পরিস্থিতি ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছে, এবং উঠবে। প্রচলিত ধারণা বলে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলেই দ্রুত বাষ্পীভূত হচ্ছে ভূস্তরের জল, ফলে সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিটি এই ব্যাখ্যার তুলনায় জটিলতর। বাষ্পীভবন অবশ্যই ঘটছে; প্রবল গ্রীষ্মে জলের চাহিদা বৃদ্ধিও সঙ্কটের আর একটি কারণ। কিন্তু, তার চেয়ে অনেক বড় কারণ নিহিত আছে ভারতের জল পরিকল্পনায়। দেশের উন্নয়ননীতিতে জলের প্রশ্নটি যত বার এসেছে, কার্যত প্রতি বার এসেছে একটি নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে— কী ভাবে যত বেশি সম্ভব গৃহস্থালিতে নলবাহিত পরিশোধিত জল পৌঁছে দেওয়া যায়। ফলে, দেশের জলনীতিও নির্ধারিত হয়েছে এই একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই। অনিবার্য ভাবে, সে নীতি সর্বাঙ্গীণ হয়নি। ২০১৮ সালে নীতি আয়োগের রিপোর্ট সাবধান করে দিয়েছিল যে, ভারতের শহরাঞ্চলে অদূর ভবিষ্যতেই জলসঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে আরও একাধিক গবেষণা, সমীক্ষা, রিপোর্ট এই একই কথা বলেছে। কিন্তু, রাজ্য ও পুর স্তরে এই সমস্যাকে দেখা হয়েছে আপৎকালীন পরিস্থিতি হিসাবে— যখনই কোথাও তীব্র জলাভাব দেখা দিয়েছে, প্রশাসন তখন কোনও রকমে জলের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। মূল সমস্যার সমাধান হয়নি।

সঙ্কটের মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় শহরই গড়ে উঠেছে যথেচ্ছ ভাবে। যত মানুষ সেখানে বাস করছেন, নগর পরিকাঠামো সে তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। এমনকি, যখন নতুন শহর গড়ে উঠেছে, তখনও নগর পরিকল্পনার মধ্যে জল সরবরাহ ও নিকাশিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে, জলের সঙ্কট শহরগুলির কাঠামোগত। যে-হেতু প্রতিষ্ঠিত শহরকে নতুন করে ঢেলে সাজানো অসম্ভব, ফলে বর্তমান পরিকাঠামোর উন্নতির ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োগ জরুরি ছিল। ভারতের কোনও শহরই সে কাজ করতে পারেনি। জলের মতো অতি সীমিত সম্পদের অপচয় রোধের চিন্তা নগর-পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায় না। এখনও পুরসভাগুলি জলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কর রাজস্ব আদায় করে না। জল অপচয় বন্ধ করার এটিই সহজতম পথ। শহরের রাজপথে বেরোলে দেখা যায়, রাস্তার কলগুলি থেকে অবাধে জল পড়েই চলেছে। নাগরিক সচেতনতা তৈরির কোনও সম্যক চেষ্টাও দেখা যায় না। তার ফল ভুগতে হচ্ছে।

অপচয়ের আরও বড় প্রমাণ, ভারতের বড় শহরগুলিতে বৃষ্টির জল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। পিচ-কংক্রিটে মোড়া শহরে জল স্বাভাবিক ভাবে ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না— নালা দিয়ে তা বয়ে যায়, নিকাশির জলে মিশে নষ্ট হয়। রেন ওয়াটার হারভেস্টিং-এর কাজ বড় মাপে কোনও শহরেই কার্যত হয়নি। ঠিক ভাবে কাজ হলে এই পথেই ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়ার সমস্যাটি বহু দূর অবধি ঠেকানো সম্ভব হত। অন্য দিকে, নিকাশি পরিশোধনের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত, এবং অপরিকল্পিত। দিল্লির মতো শহরে নিকাশির জল পরিশোধিত হয়ে ফের মিশে যায় বর্জ্যবাহী নালার জলে— ফলে, পরিশোধন কেন্দ্রগুলি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। জলের সঙ্কট ক্রমে তীব্রতর হবে। ফলে, এক বিন্দু জলও অপচয় করা চলে না। প্রতিটি শহরেই গুরুত্ব দিতে হবে নিকাশির জল পরিশোধনের মাধ্যমে তা পুনর্ব্যবহারের উপরে। নয়তো, অদূর ভবিষ্যতে ভারতের শহরগুলি জলের অভাবে এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের সম্মুখীন হবে, থমকে যাবে আর্থিক অগ্রগতি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Water crisis Climate Crisis

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy