E-Paper

লক্ষ্যাভিমুখে

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে প্রথমেই যে কথাটি উল্লেখ করা দরকার, তা হল ভারতে সংবিধান চালু হওয়ার সময়েই ‘প্রতিশ্রুতি’ ছিল, সমাজের অনুমোদনক্রমে ভবিষ্যতে ক্রমে ভারতীয় রাষ্ট্র এই বিধি প্রয়োগ করতে সম্মত হবে।

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৪

পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বার বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে যে কয়েকটি বড় ‘পরিবর্তন’ আসবে বলে মনে করা হয়েছিল, তার একটি হল অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন। এ কথা সর্বজ্ঞাত যে হিন্দুত্ব প্রকল্পের তিনটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য— রামমন্দির, ৩৭০ ধারা বিলোপ ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু, এর মধ্যে শেষটিই বাকি, এবং এই শেষটিই এখন রাজ্য স্তরে সূচনা করা বিজেপির উদ্দেশ্য। সুতরাং নতুন সরকার গঠনের দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই বিধি চালু করার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম পদক্ষেপ। এই রাজ্যের জনসমাজের এক বিরাট অংশ মুসলমান সংখ্যালঘু, এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের পিছনে বিজেপির প্রকৃত প্রণোদনাই হল মুসলমান সমাজের জন্য ‘পার্সোনাল ল’ বা নির্দিষ্ট বিশেষ আইনি রক্ষাকবচগুলির প্রত্যাহার— ফলে এই অভিমুখে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ আসবে জানাই ছিল। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই-এর নেতৃত্বে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আলোচনার পরিসরটি নির্দিষ্ট করে দিলেন। আশা থাকল, অগস্ট মাসে বিলটি পেশ করার আগে আনুষ্ঠানিক কমিটির আলোচনা-বিবেচনার পাশাপাশি নাগরিক পরিসরেও এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উঠে আসবে, এবং সেই চর্চা সরকারের অন্তর্বলয়েও প্রবেশ করবে। বলা বাহুল্য, রাজ্যের স্বস্তি ও স্থিতির কথা বিচার করে এ বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা অতীব জরুরি।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে প্রথমেই যে কথাটি উল্লেখ করা দরকার, তা হল ভারতে সংবিধান চালু হওয়ার সময়েই ‘প্রতিশ্রুতি’ ছিল, সমাজের অনুমোদনক্রমে ভবিষ্যতে ক্রমে ভারতীয় রাষ্ট্র এই বিধি প্রয়োগ করতে সম্মত হবে। তবে সেই ‘অনুমোদন’, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পরিসরও কিন্তু নির্মাণ বা রক্ষা করা যায়নি, যাকে ভারতীয় রাজনৈতিক সমাজের ব্যর্থতা বলা যেতে পারে। ক্রমে এই প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা দাঁড়িয়ে যায়। যে বিষয়টির বৃহত্তর সামাজিক অনুমোদনের দিকে এগোনোর কথা ছিল, তা ক্রমে পরিণত হয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির হাতিয়ারে। বিস্ময়ের বিষয়, উদারবাদী ও বাম রাজনীতি উপলব্ধি করেনি যে এই বিধি কেবল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অস্ত্র হতে পারে না। যে কোনও উদার আধুনিক সমাজে বিবাহ, উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধর্মগোষ্ঠীনির্বিশেষে সমস্ত নাগরিককে একই আইনের আওতায় নিয়ে আসা একটি সহজ যুক্তির কথা। বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আইন গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী হতে পারে, ব্যক্তি-অধিকারের বিরোধী হতে পারে। এই ব্যর্থতা থেকেই এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি একটি সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক দলস্বার্থের রূপ পেয়েছে। অভিন্ন বিধির মধ্যে নিহিত ব্যক্তি-অধিকারের বিপক্ষে কেবলই ব্যবহার করা হয়েছে কৌম বা গোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়টি— অথচ শাহবানো মামলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে এই দুই আদর্শের দ্বন্দ্ব স্পষ্টতই প্রকট। গত কয়েক দশক এই দ্বন্দ্বকে অগ্রাহ্য করেই ভারতীয় গণতন্ত্র এগিয়েছে।

তবে কিনা, এখন যে দ্রুততায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাশ করার প্রয়াস হচ্ছে, তাতে সন্দেহ হয়, জটিলতা বাড়বে বই কমবে না। দ্রুত ও অসংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় এই কাজ সমাধা হলে গণতন্ত্রের জায়গায় এসে দাঁড়াবে সংখ্যাগুরুতন্ত্র। মনে রাখা ভাল, গণতন্ত্রে যাঁরা সংখ্যায় কম, তাঁদের কথা শোনা ও তাঁদের গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি, তাই সতর্ক ভাবে এগোনো কর্তব্য। ফলত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির গুরুত্ব স্বীকার করেও বলতে হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের মতো সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত রাজ্যে অযথা তাড়াহুড়ো না করে সমাজের নানা অংশের মধ্যে মতবিনিময় ও মতসমীক্ষার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত গ্রহণই বাঞ্ছনীয়। আশা করা যায়, নতুন শাসক বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে তদনুসারে এগোবেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Uniform Civil Code BJP West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy