বঙ্গে কোথায় রাজনীতির জমি ফুরায়, আর কোথা থেকে দুষ্কৃতীদের ইজারা শুরু হয়, সে সীমারেখা বহু আগেই ঝাপসা হতে হতে ক্রমে মিলিয়ে গিয়েছে। তোলাবাজি, জমি দখল, বেআইনি খাদান, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা অপরাধচক্র, আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস— এই সবই দীর্ঘ দিন ধরে এ রাজ্যের বাস্তব। আরও এক বার মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় মনে করিয়ে দিলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলি অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল, তার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এই সংস্কৃতির অবসান ঘটানো বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। শেখ শাহজাহান বা জাহাঙ্গির খানদের মতো লোকেদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের জন্য সাধারণ মানুষের যে দাবি, তা পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা। সেই সূত্রেই এল রাজ্যের নতুন গুন্ডাদমন আইন। ফলে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হল, সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রের হাতে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই ক্ষমতার উপরে কতখানি নিয়ন্ত্রণ রাখা হচ্ছে। কারণ, গণতন্ত্রে কঠোর পদক্ষেপও আইনের শাসনের অধীন; রাষ্ট্রের শাসনের নয়।
বিলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রতিরোধমূলক আটকের সংস্থান। প্রচলিত ফৌজদারি আইনে অপরাধ, তদন্ত, বিচার এবং শাস্তি— প্রক্রিয়াটি এই ক্রমানুসারে চলে। গুন্ডাদমন আইনের ক্ষেত্রে প্রশাসন যদি মনে করে যে, কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে জনশৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, তা হলে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা সম্ভব। বিলটিতে অবশ্য কিছু রক্ষাকবচের কথাও বলা আছে— যেমন, গত সাত বছরের অপরাধের রেকর্ড বিবেচনা, তিন সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি বিচারপতির নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পর্ষদের কাছে পাঠানো ইত্যাদি। সংস্থানগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, এতেও একটি মৌলিক আপত্তি দূর হয় না যে— এই আইনের প্রয়োগ বহুলাংশে প্রশাসনিক বিবেচনার উপরে নির্ভরশীল। কে ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, কোথায় ‘আতঙ্ক’ বা ‘নিরাপত্তাহীনতা’ সৃষ্টি হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক আটক প্রয়োজন, এই প্রশ্নগুলির উত্তর নির্ধারিত হবে পুলিশ ও জেলাশাসকের বিবেচনায়। অর্থাৎ, বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আগেই রাষ্ট্রের শাসনবিভাগের বিচারের পরিসর উল্লেখযোগ্য ভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। উদার গণতন্ত্র বরাবরই এই ‘এক্সিকিউটিভ ডিসক্রিশন’ বিষয়ে সংশয়ী। কারণ, ক্ষমতা যত বেশি ব্যক্তি-নির্ভর হয়, তার অপপ্রয়োগের সম্ভাবনাও তত বাড়ে। আদালতের ভূমিকা কেবল পরে সেই সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখা নয়; নাগরিকের স্বাধীনতার উপরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সীমা নির্ধারণ করাও। তাই রাষ্ট্রের সদিচ্ছা নিয়ে যদি বিতর্ক না-ও থাকে, তবু সুস্থ গণতন্ত্র কখনও রাষ্ট্রের সদিচ্ছার উপরে ভরসা করে চলতে পারে না। সে ভরসা করে আইনের নির্মাণশৈলীর উপর— যেখানে ক্ষমতার পাশাপাশি তার সীমাও স্পষ্ট ভাবে নির্ধারিত থাকে।
ভারতের প্রায় সব কঠোর আইনই এক একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির যুক্তিতে তৈরি হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার বলেছিল, অপপ্রয়োগ হবে না। বহু ক্ষেত্রেই সেই প্রতিশ্রুতি হয়তো আন্তরিকও ছিল। কিন্তু, বাস্তব অন্য কথা বলেছে। মুখ্যমন্ত্রীও বিধানসভায় আশ্বাস দিয়েছেন, এই আইন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হবে না। সেই আশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েই বলা প্রয়োজন, কোনও আইনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সরকারের বক্তব্য নয়; তার নিজস্ব সাংবিধানিক সুরক্ষা। কারণ, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়, কিন্তু আইন থেকে যায়। আজ যে ক্ষমতা এক সরকারের হাতে রয়েছে, কাল তা অন্য সরকারের হাতেও থাকবে। তাই যে আইন সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তার প্রথম দায়িত্ব অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা, আর দ্বিতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাও সমান স্পষ্ট করে দেওয়া। এই দুইয়ের ভারসাম্যই সভ্য গণতন্ত্রের পরিচয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)