E-Paper

নেত্রীবিদায়

খালেদা জ়িয়ার শাসনকাল নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক সম্ভব, তিনি গণতন্ত্র ও সামাজিক ঐক্য কতখানি প্রসারিত করেছেন, আদৌ করেছেন কি না, এ সকল প্রশ্নের অবতারণা ও আলোচনা চলুক। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের সময়ে যে এক জন বিতর্কোর্ধ্ব জননেত্রী হিসাবে তাঁর স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না।

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:৪০

নেতৃত্বের একটি সংজ্ঞা তৈরি করে গেলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জ়িয়া। তাঁর প্রয়াণের মুহূর্তটিকে ঘিরে অস্থির অশান্ত বাংলাদেশে একটি ঐক্যের ছবি তৈরি হল— যা কিয়দংশে আলঙ্কারিক ও তাৎক্ষণিক হলেও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যবান। একই সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিতাড়িত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দুই জনেই আন্তরিক শোক প্রকাশ করেছেন। রাস্তায় নেমে এসেছে মানুষের ঢল। দলমতনির্বিশেষে সকলেই খালেদা জ়িয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। রাজনীতির অঙ্গনে ভদ্রতা ও সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব এই উপমহাদেশ, বিশেষত বাংলাদেশ, যখন প্রায় ভুলতেই বসেছে, তীব্র দ্বেষ ও নৈরাজ্যের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে সমগ্র সমাজ, তখন একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও এমন দৃশ্যের জন্ম দেওয়ার কৃতিত্ব প্রয়াত নেতা বা নেত্রীরই। প্রাক্তন সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট জ়িয়াউর রহমানের স্ত্রী, নিজে কৃতী রাজনীতিক ও নির্বাচিত দেশপ্রধান খালেদার উদ্দেশে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকেও প্রভূত সম্মানবাক্য উচ্চারিত হল, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মুখেও। তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর গেলেন, এই আপাতস্বাভাবিক ঘটনাও এই মুহূর্তে বিশেষ দামি, যখন তিক্ত ভারতবিরোধিতা বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি জুড়ে কর্ণপটহবিদারী। খালেদা জ়িয়ার শাসনকাল নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক সম্ভব, তিনি গণতন্ত্র ও সামাজিক ঐক্য কতখানি প্রসারিত করেছেন, আদৌ করেছেন কি না, এ সকল প্রশ্নের অবতারণা ও আলোচনা চলুক। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের সময়ে যে এক জন বিতর্কোর্ধ্ব জননেত্রী হিসাবে তাঁর স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের হয়তো একটি শিক্ষাও গ্রহণ করা উচিত। দেশকে ক্রমশই অশান্তির আবর্তে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার দায়টি কিন্তু সরকারেরই, মুহাম্মদ ইউনূস যতই সেই দায় কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন না কেন। উন্মত্ত ধ্বংসক্ষিপ্ত জনতাকে সামলানোর কী পদ্ধতি হতে পারে, সে ভাবনাও সরকারেরই। প্রকৃত নেতৃত্বগুণের পরিচয়, চ্যালেঞ্জ সামলানোর ক্ষমতার মধ্যে। সর্বোপরি, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা বা নেত্রী তৈরি হওয়ার গুরুত্বও খালেদা বুঝিয়ে গেলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ যতই থাকুক, অন্তহীন হত্যা, ধ্বংস, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে, এবং ভারতবিরোধী হুঙ্কার ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেশকে যে কোনও ভাবেই ন্যায় বা ঐক্য বা স্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না, সে কথা নিশ্চয়ই সকলেই অবগত। সে ক্ষেত্রে সদ্য ঘোষিত নির্বাচনসূচি মেনে সুস্থিত ভাবে তা ঘটানোর দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের, এবং সে পথে কোনও অবাঞ্ছিত বাধা এলে তা দূর করার দায়িত্বও সরকারের— ক্ষমতাবলের অধিকারে, মুহাম্মদ ইউনূসের।

স্বীকার করতেই হয়, মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থানটি ঈর্ষণীয় নয়। অতি কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন তিনি, তাঁর চার দিকে অগণিত সঙ্কট, প্রতিটিই তীক্ষ্ণ ও তীব্র। কিন্তু ২০২৪ সালের অগস্টেও বোঝা গিয়েছিল পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হবে। তখন অতি-আগ্রহে শীর্ষ প্রশাসনিক পদটি গ্রহণ করেছিলেন ইউনূস, অনেক উচ্চাঙ্গের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। পরবর্তী ঘটনাক্রম বুঝিয়েছে যে, সেই সব প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি ও তাঁর সরকার কেবল অক্ষম নন, সম্ভবত অনিচ্ছুকও। রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য কেবল রক্তক্ষয় এবং ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিই লাগে না, সদর্থক ভাবনা ও শান্তি-স্থিতির চিত্রাঙ্কনও জরুরি। বাংলাদেশবাসীর এক বিরাট অংশ যে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিরতার জন্য কতখানি ব্যাকুল হয়ে আছেন, খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের পর স্বাগত-অভিবাদনের জনজোয়ারই তার অভিজ্ঞান। প্রতিবেশী দেশে সেই স্থিরতার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষমাণ ভারত-সহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh Sheikh Hasina India-Bangladesh Muhammad Yunus

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy