হাওড়া সিটি পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন— ভোটের সময় কিছুটা ছাড় তো দিতেই হয়। ছাড়— বাসের ছাদে বসে গন্তব্যে পৌঁছনোর। সাধারণ সময়ে যে ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে, নির্বাচনের সময় তাতেই ঢিলে দিয়েছে পুলিশ। ফলে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতি দিন বাড়ির পথে যাত্রা করছেন অগুনতি মানুষ, নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যে। ঝুঁকিবিহীন সফরের উপায়ও তো নেই। এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষে রাস্তায় গণপরিবহণের সংখ্যা গত কয়েক দিনে উদ্বেগজনক ভাবে কমেছে। ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক, চাকরিজীবীরা তবে বাড়ি ফিরবেন কোন পথে? দূরপাল্লার ট্রেন থেকে বিভিন্ন স্টেশনে নামা অসংখ্য পরিশ্রান্ত মানুষ তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকেছেন। প্রবল ভিড়ে ট্রেনে ওঠা অসম্ভব, হাতেগোনা বাসে জায়গা মেলেনি, ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করার সামর্থ্য নেই। ফলে, কখনও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে, কখনও বাসের ছাদে বসে বিপজ্জনক যাত্রাকেই বেছে নিতে হয়েছে তাঁদের। বাড়ি ফেরার এই আকুতি-চিত্র সেই লকডাউন-কাল পেরিয়ে এখনও ঘোর বাস্তব। কেন কখনও এই মানুষগুলির প্রয়োজনের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয় না— দেশের, রাজ্যের নির্বাচিত সরকারকে তার জবাবদিহি করতে হবে।
একই অবস্থা স্কুলগুলিরও। যে সমস্ত স্কুলকে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বা যেগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সেগুলির কথা ছেড়ে দেওয়াই ভাল। সেখানে নিয়মিত পঠনপাঠন কবে শুরু হবে, তা ঘোর অনিশ্চিত। যে স্কুলগুলি সরাসরি নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছে, সেখানেও শিক্ষার্থীদের অবস্থা শোচনীয়। তাদের স্কুলে যাতায়াতের পথটি অবরুদ্ধ হয়েছে। বহু স্কুলগাড়ি অধিগ্রহণ করে ভোটের কাজে লাগানো হয়েছে, অনেক গাড়ি আটক করা হয়েছে। বিপদ বুঝে অনেক স্কুল অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে। কিছু স্কুল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শিক্ষার্থীর যাতায়াতের দায়িত্ব অভিভাবকের উপর চাপিয়েছে। এটি কি কোনও বাস্তব সমাধান? যেখানে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলি শিক্ষকের অভাব, পরিকাঠামোগত সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণে বিপদগ্রস্ত, সেখানে নির্বাচনী কাজে বিদ্যালয় ভবন, শিক্ষকদের নিয়োজিত করা শিক্ষার বিবর্ণ চিত্রটিকে যে বিবর্ণতর করে তুলবে, সে কথা বহু আলোচিত। রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক সে দিকেই হাঁটছে। অনলাইন ক্লাসে যোগদান করা সমস্ত শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব নয়, প্রতি দিন শিশুকে নিয়ে স্কুলে যাতায়াতের পরিস্থিতিও সমস্ত অভিভাবকের থাকে না। তাদের ক্ষেত্রে বিকল্প তবে কী হবে?
নির্বাচন গণতান্ত্রিক দেশের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাকে সুষ্ঠু, সুসংহত ভাবে পরিচালনা করাই গণতান্ত্রিক সরকার, নির্বাচন কমিশনের কাজ। অথচ, এ দেশে, বিশেষত এ রাজ্যে যে ভাবে সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় ফেলা হচ্ছে, তাদের তটস্থ করে দৈনন্দিন কার্যকলাপ প্রায় বন্ধের উপক্রম হচ্ছে, তা অমার্জনীয়। দেশের আয়তন, জনসংখ্যা এর অজুহাত হতে পারে না। বরং সে কথা মাথায় রেখেই সুস্পষ্ট পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল যাতে কোনও পক্ষের অযথা হয়রানি না হয়। সে কাজ হয়নি। বরং গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে মানুষের অন্য মৌলিক অধিকারগুলি বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রহসন বইকি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)