E-Paper

মূল্যবিহীন

শিক্ষার অধিকার সব শিশুরই বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করে। বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুদের ক্ষেত্রে এই অধিকারকে আরও পোক্ত করে ২০১৬-র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন। হস্টেলের বরাদ্দ ফেলে রাখলে এই অধিকারগুলি খর্ব হয়।

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৬

বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে (স্পেশ্যাল স্কুল) অধ্যয়নরত দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিহীন ও বিশেষ ভাবে সক্ষম পড়ুয়াদের অনেকেই প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার ও অভাবী পরিবারের, তাই আবাসিক ব্যবস্থাই এদের শিক্ষার একমাত্র পথ, কোনও ঐচ্ছিক সুবিধা নয়। অথচ এমন অপরিহার্য পরিষেবায় হস্টেলে থাকা-খাওয়ার খরচ বাবদ পড়ুয়াপিছু মাসিক ১৬০০ টাকা মিলছে না দীর্ঘ পাঁচ মাস, যা কার্যত হস্টেল চালানো কঠিন করে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যেখানে উৎসব, প্রচারমূলক কর্মসূচিতে বা ভোটমুখী জনমোহিনী প্রকল্পে বাজেটবহির্ভূত বিপুল অর্থ ব্যয়ে সমস্যা হয় না, সেখানে বিশেষ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাজেট-নির্ধারিত যৎসামান্য বরাদ্দটুকুতে এ-হেন টানাটানির প্রসঙ্গ অযৌক্তিক ও চরম ঔদাসীন্যেরই পরিণাম নয় কি? উপরন্তু, এতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নের যত্ন সম্পর্কিত নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বের অবমাননা হয়।

এই বিলম্বকে অকারণ কার্পণ্য বলাই সমীচীন, এবং এটি আরও এক সঙ্কটের বার্তাবহ। বর্তমান বাজারদরের পরিপ্রেক্ষিতে, ছাত্রপিছু খরচ হিসাবে উক্ত অর্থের পরিমাণ অবাস্তব, তা বাড়িয়ে মাথাপিছু ২,২০০ টাকা করার যে প্রতিশ্রুতি মিলেছিল— যা কাগজেই রয়ে গিয়েছে, তাও কিন্তু চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা বেতন থেকে খরচ মেটাচ্ছেন, দোকানদাররা আর বাকিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দিতে রাজি নন। প্রশাসনের জনকল্যাণের দায়িত্ব কারও কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া নীতিবহির্ভূত তো বটেই, এমন ভঙ্গুর ব্যবস্থার উপর শিশুদের দায়িত্ব থাকাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এদের শিক্ষার ক্ষেত্রটিকে সর্বতোভাবে অবহেলাই দস্তুর। সাধারণ স্কুলেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পড়ুয়াদের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো থাকার কথা। আইনসঙ্গত অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন সাধারণ বিদ্যালয়েও বৈচিত্রময় শিক্ষাগত চাহিদা পূরণে সক্ষম পর্যাপ্ত শিক্ষক বা ‘স্পেশ্যাল এডুকেটর’ থাকেন। অথচ রাজ্যে প্রশিক্ষিত বিশেষ শিক্ষকের মারাত্মক ঘাটতির বিষয়টি বারে বারে সমালোচিত, এঁদের চুক্তি ও বেতন সংক্রান্ত অসন্তোষ আদালত পর্যন্ত গড়ানোর পরে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু তৎপরতার কথা শোনা যাচ্ছে। এই অভাব মেটানোর ভার বিশেষ স্কুলগুলির উপরেই, সেগুলিও অর্থাভাবে ধুঁকলে গোটা পরিকাঠামোই ভেঙে পড়ার উপক্রম ঘটে, অন্তর্ভুক্তির নামে যা বঞ্চনাকেই ত্বরান্বিত করে।

এই অবহেলা মানবাধিকার পরিপন্থী, শিক্ষার অধিকার আইনের লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, শিক্ষার অধিকার সব শিশুরই বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করে। বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুদের ক্ষেত্রে এই অধিকারকে আরও পোক্ত করে ২০১৬-র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন। হস্টেলের বরাদ্দ ফেলে রাখলে এই অধিকারগুলি খর্ব হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বকেয়া অবিলম্বে মেটানো, বরাদ্দটুকুর বাস্তবসম্মত পুনর্বিবেচনার সঙ্গে মূলধারার বিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ শিক্ষক নিয়োগে প্রশিক্ষণে বিনিয়োগও করতে হবে। প্রশাসন কোথায় খরচ করছে আর কোথায় টালবাহানা হচ্ছে, তা কিন্তু কাদের মূল্য দেওয়া হচ্ছে, সেই বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনে। অতএব এই ব্যর্থতা প্রশাসনের পক্ষে অস্বস্তিকর, আশু সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল এই শিশুদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Specially Abled Teachers Recruitment Schools

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy