শঙ্খ সংস্কৃতি বস্তুটি বঙ্গভূমি থেকে উঠে যেতে বসেছে। তাই শাঁখের করাত এ যুগের মানুষের কাছে অচেনা ঠেকতে পারে। ব্যাকরণ বইয়ে নেই-নেই করে এখনও একটি প্রবচন-তালিকা পাওয়া যায়, তার দৌলতে হয়তো কিছু মানুষ শব্দবন্ধটি শুনে থাকতেও পারেন। বলাই যায় যে, ‘ভাবমূর্তি’ বিষয়টি খানিক শাঁখের করাতের মতো, এ দিক-ও দিক দুই দিকেই কাটে। অন্যেরা কে কী বলছে, কী ভাবে দেখছে, তার উপর যদি নিজের অস্তিত্বের অধিকাংশ নির্ভর করে, বিশেষত রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব— তা হলে সুখের দিনের পাশাপাশি দুঃখের দিনও অবধারিত, শাঁখের করাতের দুই দিকের ধারের মতোই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হয়তো এই মুহূর্তে সেই অনুভবের মধ্যে রয়েছেন। জেফ্রি এপস্টিন ফাইলে তাঁর বিষয়ে কী আছে, সে কথা এখন দেশবিদেশে গুঞ্জরিত হচ্ছে, ঠিক যেমন তিনি ও তাঁর সরকার ‘বিশ্বগুরু’ পরিচয়টি বিশ্বময় ও দেশময় গুঞ্জরিত করতে ছুটেছিলেন। সেই গুরুসম প্রধানমন্ত্রী ইজ়রায়েলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের লাভের জন্য নাচগান করছেন বলে যে রটনা, তার সত্যমিথ্যা কিছুই প্রমাণিত নয়। সুতরাং কথাটি উঠলেও তাকে সম্পূর্ণত অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করলেও চলত। সেটা যে করা যাচ্ছে না, এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী নেতা তা দেশকে মনে করাচ্ছেন, এ এক রাষ্ট্রীয় লজ্জা হয়ে দাঁড়াল। রাহুল গান্ধী নরেন্দ্র মোদীর এই ভাবমূর্তি-বিষয়ক সঙ্কটটি সর্বসমক্ষে তুলতে চেয়ে ভুল করেছেন, এমন বলা যাবে না, শাসকের বিরুদ্ধে বিরোধী নেতা এমন অস্ত্র পেয়ে গেলে ছাড়বেনই বা কেন। গত মঙ্গলবার সংসদে আক্রমণাত্মক ভাবে তাঁকে আটকানো হল বক্তব্য পেশ করা থেকে, কিন্তু তাতে কি লজ্জার ভাগ কিছু কম পড়ল?
প্রসঙ্গত, আমেরিকার ধনকুবের এপস্টিনকে যৌন অপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা হয় ২০০৮ সালে, ১৮ মাস জেলবাসের পর তিনি মুক্তি পান, এবং ২০১৯ সালে তিনি আবার জেলবন্দি হন নাবালক যৌনতার চক্র চালানোর অভিযোগে। জেলবাসকালীন তিনি আত্মঘাতী হন বলেই সংবাদে প্রকাশ। আপাতত তাঁর সমস্ত ফাইল প্রকাশ্যে আসার পর নাকি অনেক গোপন তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্বের বহু দেশের বহু বিখ্যাত ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি বিষয়ে। আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে ও ভারতের নেতারাও তার মধ্যে আছেন। এই তালিকায় নাম শোনা গিয়েছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন, কিংবা বিল গেটস বা ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরেরও। সত্যতা প্রমাণের সাগর পেরোনো এখনও বাকি, কিন্তু ‘এপস্টিন ফাইলস’ বিষয়টি ইতিমধ্যেই বিশাল পরিমাণ আন্তর্জাতিক কভারেজ পেয়েছে। নরেন্দ্র মোদী বিষয়ে যেটুকু শোনা গিয়েছে, তাতে মর্যাদাসম্পন্ন ভারতীয় নাগরিকের স্বাভাবিক আক্ষেপ, এটুকুও না শোনা গেলেই ভাল হত।
সময়টি এমনিতেই কঠিন। আমেরিকা যু্ক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সংবেদনশীলতা প্রতি দিন আরও তীব্র হচ্ছে। ট্রাম্পের নিত্যনতুন ঘোষণায় ভারতের সামনে বড় মাপের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে এই সব ব্যক্তিগত কুৎসা এবং তৎসূত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাধ্যবাধকতার কথা শুনতে হওয়াও ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে হানিকর। এ কেবল কোনও ব্যক্তিগত সঙ্কটের বিষয় নয়, রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রশ্ন। সে প্রশ্ন না উঠলেই মঙ্গল হত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)