এ রাজ্যে মাধ্যমিক তো শুধুমাত্র একটি বোর্ডের পরীক্ষা নয়, এর সামাজিক সংযুক্তিটি লক্ষণীয়। কিছু বছর পূর্বেও মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে অটোর লাইনে আগে জায়গা দেওয়া হত, অ্যাডমিট ভুলে যাওয়া পরীক্ষার্থীকে পুলিশ নিজের বাইকে বসিয়ে সাহায্যের জন্য ছুটত। বর্তমানে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির ঝকঝকে উপস্থিতি, সর্বভারতীয় পাঠ্যক্রম, পরীক্ষাসূচি ইত্যাদি মাধ্যমিকের ঔজ্জ্বল্য হয়তো কিছু কমিয়েছে, কিন্তু এখনও রাজ্যের এক বিশাল সংখ্যক অভিভাবক এবং তাঁদের সন্তানরা কেরিয়ারের ক্ষেত্রে মাধ্যমিককেই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক গণ্য করে থাকেন। এই বছরও প্রায় দশ লক্ষ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পরীক্ষার গোড়ার দিনগুলি মোটামুটি নির্বিঘ্নেই অতিক্রান্ত।
কিন্তু এই বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পর্ব নির্বিঘ্নে কাটবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। সমগ্র প্রক্রিয়ায় বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) হিসাবে এক বিশাল সংখ্যক শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। এই নিয়োগ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ অসুবিধাজনক, কারণ ইতিমধ্যেই স্কুলগুলিতে উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষকের অভাবে দৈনন্দিন পঠনপাঠন চালানো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তদুপরি, শিক্ষক নিয়োগে ঘোর অনিয়ম এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রায় ছাব্বিশ হাজার শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিলের প্রবল চাপ সহ্য করতে হয়েছে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে। তার জের না কাটতেই এসআইআর পর্ব শুরু। শিক্ষকদের অনেককেই বিএলও-র কাজের পাশাপাশি পরীক্ষার দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে, যে কাজ সমান দায়িত্বপূর্ণ ভাবে চালিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। কিন্তু তা যে সম্ভব হতে পেরেছে, তার জন্য তাঁরা প্রশংসার্হ। সংবাদে প্রকাশ, আউশগ্রামের এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী খেতের কাজে ব্যস্ত থাকায় সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছতে পারেনি। শিক্ষকরাই তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্বটি পালন করেন। স্কুলছুট, পরীক্ষাছুটের বহু বিবর্ণ পরিসংখ্যানের মাঝে দায়িত্ববোধের এই টুকরো ছবিটি অনেকখানি স্বস্তি দেয়। আশা, আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাতেও এই ধারাটিই অব্যাহত থাকবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই ভাবা প্রয়োজন, যে আগাম প্রস্তুতি, সুষ্ঠু পরিকল্পনার হাত ধরে দুই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার পরিচালনাটি এমন মসৃণ হতে পারে প্রতি বছর, সেই উদ্যোগ কেন স্কুলের দৈনন্দিন কার্যে দেখা যায় না? কেন সেখানে সর্বক্ষণ এমন হতশ্রী দশা বিরাজ করে? সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। ফের স্কুলগুলিকে নির্বাচন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা হবে। ফের দীর্ঘ সময় দৈনন্দিন পঠনপাঠন বন্ধ থাকবে। তদুপরি রয়েছে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের মর্জিমাফিক গ্রীষ্মাবকাশকে দীর্ঘায়িত করার প্রক্রিয়া। এ সবের মাঝে যে স্কুলগুলির মুখ্য উদ্দেশ্যটিই নষ্ট হচ্ছে, সে কথা ভাবে কে? অবিলম্বে এই কুচক্র থেকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে মুক্ত করা হোক। নির্বাচন কালে স্কুলের বিকল্প কেন্দ্র ভাবা হোক। একান্ত সম্ভব না হলে কী করে শ্রেণিকক্ষের পড়ার ক্ষতি আটকানো যায়, তার ভাবনাচিন্তা শুরু হোক। শিক্ষার অধিকারটি সংবিধানপ্রদত্ত। তাতে অবহেলা সংবিধান অবমাননার শামিল। রাজ্য সরকারই স্থির করুক, তারা কোন পথে যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)