E-Paper

সম্পর্ক

আদালতে হলফনামা পেশ করে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, কাট-অফ কমানোর ফলে কোনও ক্ষতি হয়নি— কারণ, যাঁরা এই পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, এবং প্রত্যেকেই অন্তত ৫০% নম্বর-সহ এমবিবিএস পাশ করেছেন।

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:২৪

অর্থনীতির মৌলিকতম ধর্মটি কী, জানতে চাইলে উত্তর একটিই— শেষ অবধি এমন একটি মূল্যস্তরে উপনীত হওয়া যাবে, যেখানে চাহিদা এবং জোগান সমান। অর্থাৎ, গোড়ায় যদি জিনিসের দাম বেশি থাকার কারণে চাহিদা কম হয়, তবে তত ক্ষণ অবধি দাম কমতে থাকবে, যত ক্ষণ না কোনও একটি নির্দিষ্ট দামে চাহিদার পরিমাণ সেই দামে জোগানের পরিমাণের সঙ্গে সমান হয়। আবার, জোগানের দিক থেকেও একই ঘটনা ঘটা সম্ভব। এ বার, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক এবং ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন যদি বাজার অর্থনীতির এই মৌলিক সত্যটিকে গ্রহণ করতে চায়, তাতে বাধা দেওয়া কি ঠিক কাজ? ২০২৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর স্তরের ভর্তি-পরীক্ষা নিট-পিজি’তে কাট-অফ, অর্থাৎ পড়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য ন্যূনতম নম্বরের সীমা, হঠাৎ অনেকখানি কমিয়ে দেয়। জানা গিয়েছে, তার কারণ হল, কাট-অফ বেশি থাকলে অনেক আসন খালি থাকার আশঙ্কা ছিল। একেবারে সোজা হিসাব— স্নাতকোত্তরের আসন হল পণ্য, আর নম্বর হল সেই পণ্যের দাম। জোগান যে হেতু স্থির, ফলে যে দামে সব পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে— অর্থাৎ, কাট-অফ যতখানি কমালে সব আসন ভর্তি হবে— সেটাই এই বাজারের ‘ইকুইলিব্রিয়াম’। অর্থনীতির দর্শনের এমন প্রয়োগের জন্য যাদের বাহবা পাওয়ার কথা ছিল, তাদেরই যদি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়— এমন জলবৎ যুক্তিকেও যদি ব্যাখ্যা করতে হয়— তবে কি ভবিষ্যতে আর কোনও আমলা মাছিমারা কেরানির পরিবর্তে এমন অসামান্য ‘সুবিবেচক’ হয়ে ওঠার সাহস করবেন?

কিন্তু, এই মুহূর্তে জবাবদিহি করতেই হচ্ছে। আদালতে হলফনামা পেশ করে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, কাট-অফ কমানোর ফলে কোনও ক্ষতি হয়নি— কারণ, যাঁরা এই পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, এবং প্রত্যেকেই অন্তত ৫০% নম্বর-সহ এমবিবিএস পাশ করেছেন। অতএব, তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না। ভাবটা এই যে, স্যাকরার দোকানে এক বার কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হলে সেই সোনার গুণমান নিয়ে আর কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। তেমনই, এক বার যাঁরা মেডিক্যাল কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তি হতে পেরেছেন, স্নাতকোত্তর স্তরের জন্য তাঁদের যোগ্যতাও কি স্বতঃসিদ্ধ নয়? এমন তো নয় যে, সরকার হঠাৎ ইতিহাসের ছাত্রদের ধরে এনে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি করে দিচ্ছে— তা হলে এত হল্লা কিসের, এটাই সরকারের মনোভাব। তার চেয়েও বড়় কথা, এ ভাবে যদি প্রতিটি ধাপে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়, তা হলে এই ছাত্রছাত্রীদের মনে হতেই পারে যে, তাঁদের উপরে রাষ্ট্রের আদৌ কোনও আস্থা নেই। সম্পর্কের গোড়ায় যদি সেই অবিশ্বাসের আঘাত লাগে, তা হলে কি কখনও সে সম্পর্কের পূর্ণ বিকাশ হতে পারে? এই ‘বিকশিত ভারত’-এর পথে, যাঁরা খামোকা কাট-অফ নিয়ে চিন্তিত, এই দার্শনিক চিন্তাগুলি তাঁদেরও ভাবাচ্ছে নিশ্চয়ই। অবশ্য, পাশাপাশি কেউ এ কথাও ভাবতে পারেন যে, ভর্তি-পরীক্ষা রাখার আদৌ দরকারই বা কী? বেশ কিছু দিন ধরেই ভারতে চিকিৎসা-গবেষণা বস্তুটি মূলত বিশ্বাসের উপরেই চলছে— গোমূত্রের উপকারিতায় বিশ্বাস, গণেশের প্লাস্টিক সার্জারিতে বিশ্বাস। অতঃপর নাহয় ছাত্রদের অপরীক্ষিত যোগ্যতার উপরেও ভরসা রাখবেন সাধারণ মানুষ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Medical Examination NEET PG 2025 cut off marks

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy