ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত মেয়েদেরই বিপর্যস্ত করবে বেশি, বলছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। কারণ, যুদ্ধের ধাক্কায় উন্নয়নশীল দেশগুলির ঋণের বোঝা যত বাড়ে, তত বাড়ে মেয়েদের কর্মহীনতা, পাশাপাশি কমে আসে সরকারি সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয়। বিশ্বের পঁচাশিটি দেশ থেকে গত তিন দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থা ইউএনডিপি দেখিয়েছে, ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে সরকার জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলিতে খরচ কমাতে চায়। তাতে মেয়েরা ক্ষতিগ্রস্ত হন দু’ভাবে। এক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিচর্যার নানা ক্ষেত্রে নিযুক্তদের মধ্যে মহিলা-কর্মী বেশি, তাঁদের কাজ চলে যায়। দুই, সামাজিক সহায়তার বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ ছেঁটে দেয় সরকার, ফলে বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ে মেয়েদের উপরে। তেল এবং সার, এ দুটো আমদানি করতে হচ্ছে যে দেশগুলিকে, তারা ঋণের বোঝা কমানোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, আবাস, স্বরোজগারে সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতি খাতে ব্যয় কমানোকেই ‘সহজ’ রাস্তা বলে বেছে নেয়। কিন্তু এই খাতের টাকা যে-হেতু প্রধানত মেয়েদের কাজে লাগে, তাই আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে লিঙ্গ-বৈষম্য বাড়ে, যা দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করতে বাধ্য। ২০২২-পূর্ববর্তী এক দশকের বিশ্লেষণ করে ইউএনডিপি-র রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের যে ৮৫টি দেশ অতিশয় ঋণগ্রস্ত ছিল, সেগুলিতে স্বল্পমেয়াদে মেয়েদের কর্মনিযুক্তি কমেছে ২ কোটি ২০ লক্ষ, দীর্ঘমেয়াদে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ। মেয়েদের রোজগার মাথাপিছু গড়ে ১৭% কমেছে। তুলনায় পুরুষদের কর্মনিযুক্তি বা রোজগার তেমন কমেনি। ভারতেও কোভিড লকডাউনের সময়ে কর্মনিযুক্ত মেয়েদের ৫৩% কাজ হারিয়েছিল, পুরুষদের ১৬%।
অতএব ঋণ পরিশোধের নীতি নেওয়ার সময়ে আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের ঝুঁকি মনে রাখতে হবে সরকারকে। মেয়েদের রোজগারের মূল্য কেবল টাকার অঙ্কে কষা চলে না, উন্নয়নের গতিতে পুরুষদের আয়ের চেয়ে বেশি গতি আনে মেয়েদের আয়, দাবি করছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। ভারতের কাছে কথাটি বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য, কারণ সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ ক্রমাগত কমাচ্ছে কেন্দ্র। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্রের জন্য যা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র (জিডিপি-র ২.৫%), তা নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রথম বাজেটের (২০১৪-১৫) চেয়েও কম। যে কোনও সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে বেতন, পেনশন, ভর্তুকি, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক ক্ষেত্রে কাটছাঁট করার প্রবণতা বেড়ে যায়, তা কোভিড অতিমারির পরবর্তী বছরগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ২০২০-২১ সালে সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ ছিল জিডিপি-র ৫.৩ শতাংশ, খরচ হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ। কোভিড-পরবর্তী বছরগুলিতে ক্রমাগত কমে গিয়ে ২০২৫-২৬ সালে সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ জিডিপি-র ২.৩ শতাংশ এবং (সংশোধিত বাজেটে) ব্যয় মোট ব্যয়ের ১৭ শতাংশ।
রয়েছে বরাদ্দ ও ব্যয়ে অসঙ্গতিও— অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের পেনশন প্রভৃতি সামাজিক সুরক্ষার খাতে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হচ্ছে না। যে-হেতু মহিলা শ্রমিকদের অধিকাংশই কাজ করেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে, তাই ক্ষতিটা তাঁদেরই বেশি। আমেরিকা শুল্ক বাড়ানোর ফলে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতের তৈরি-বস্ত্র এবং সামুদ্রিক মাছ রফতানির ক্ষেত্র, যে দু’টি শিল্পে প্রচুর মেয়ে কাজ করেন। অনেক মেয়ে কাজ হারিয়েছেন, বাকিরা বাধ্য হচ্ছেন কম মজুরিতে বেশি সময় কাজ করতে। শিল্পে নিয়োগ থেকে মেয়েরা ফিরে যাচ্ছেন বেতনহীন গৃহশ্রমে, স্বনিযুক্তির অনিশ্চয়তায়। পুরুষ-মহিলা মজুরিতে ফারাক কমছে না, বাড়ছে খাদ্য-সহ অত্যাবশ্যক পণ্যের দাম। মেয়েদের শ্রমের এই অবমূল্যায়ন পরিবারের আয় কমায়, ফলে সন্তানের অসম্পূর্ণ শিক্ষা, অপূর্ণ পুষ্টি প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয় সঙ্কোচের ‘সহজ’ উপায় নিলে দেশের উন্নয়ন আরও কঠিন করে তুলবে সরকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)