সম্প্রতি কেরলে মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশনের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত ইউডিএফ সরকার প্রবীণ নাগরিকদের জন্য একটি বিশেষ বিভাগ চালু করার কথা ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য, প্রবীণদের কল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, সুরক্ষা এবং মর্যাদাকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে, কেরল হবে ভারতের প্রথম রাজ্য, যেখানে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ থাকবে। এ-হেন ঘোষণার অন্যতম কারণ, কেরল দেশের অন্য যে কোনও রাজ্যের চেয়ে ভিন্ন এক জনবিন্যাসের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যেখানে দেশে প্রতি দশ জনে এক জন ষাটোর্ধ্ব, সেখানে কেরলের ক্ষেত্রে তা ১৮.৭%। ২০৩৬ সালের মধ্যে এই হার ২২% ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান অভিবাসন এবং পরিবর্তনশীল পারিবারিক ব্যবস্থা ওই রাজ্যের প্রবীণদের জীবনকে প্রভাবিত করছে। নতুন সরকারের দাবি, এই অবস্থায় একটি মন্ত্রক প্রতিষ্ঠা করা হলে তা জনগোষ্ঠীর এই বিশেষ অংশের কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের উপর নজর দিয়ে এই সংক্রান্ত বিবিধ প্রকল্প ও নীতি বাস্তবায়নে সাহায্য করবে।
ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড (ইউএনএফপিএ)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত দ্বিগুণ হয়ে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি হবে। এ দেশে এত কাল যৌথ পরিবারই প্রবীণদের দেখাশোনা করে এসেছে। কিন্তু কর্মসূত্রে অভিবাসন এবং বর্তমান অণু পরিবারের জেরে আগের ব্যবস্থা টিকে থাকছে না। ফলে, প্রবীণদের দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিশেষ চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা-সহ সার্বিক বার্ধক্যকালীন সেবার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে। টেলিমেডিসিন, ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক এবং কমিউনিটি হেলথ কেয়ার-এর মতো পরিষেবাগুলির পরিধি বৃদ্ধি জরুরি হয়ে উঠছে। প্রবীণরা যাতে স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শহরে তাঁদের উপযোগী পরিবেশ ও পরিষেবা গড়ে তোলা দরকার। নগর পরিকল্পনায় অবশ্যই প্রবীণদের জন্য গণপরিসর, পথচারীবান্ধব সড়ক এবং গণপরিবহণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে, যাতে তাঁরা কোনও ভাবে বঞ্চিত না হন। অন্য দিকে, যে সব প্রবীণ কাজ করতে সক্ষম, তাঁদের বিবিধ স্বল্পমেয়াদি বা নমনীয় সময়ভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, যাতে তাঁদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বজায় থাকে, আবার সামাজিক ভাবেও উৎপাদনশীল থাকতে পারেন।
বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বার্ধক্যমুখী জনসংখ্যার দেশ হওয়ায়, জাপান তার জনগণের চাহিদা মেটাতে নানাবিধ পদক্ষেপ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এর থেকে শিক্ষা নিতে পারে, যেমনটা করতে চাইছে বর্তমান কেরল সরকার। ২০২৪ সালে আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পে প্রবীণদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তটি ভারতের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সেটুকুই যথেষ্ট নয়। জনবিন্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি ও কাঠামোরও বিবর্তন ঘটাতে হবে, যাতে প্রবীণদের ক্ষমতায়নও নিশ্চিত করা যায়। প্রবীণদের দায়িত্ব শুধুমাত্র পরিবারের নয়, এ ব্যাপারে তাদেরও যে দায়বদ্ধতা আছে, সে কথা সরকারের কখনওই ভোলা উচিত নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)