E-Paper

অচল

উদ্বেগের বিষয় হল, টিকিট বাতিলের সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। ২০২০-২১ সালে ১.৬৫ কোটি যাত্রী এই দুর্ভোগের শিকার হয়েছিলেন, চার বছরেই দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী-পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হলেন। অর্থাৎ, যাত্রী-চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ট্রেনের সংখ্যা, আসনের পরিমাণ বাড়েনি।

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৭:২২

অসংখ্য ভারতবাসী প্রতি দিন সুলভে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের উপর নির্ভরশীল। তথ্যের অধিকার আইনের অধীনে এক প্রশ্নের উত্তরে রেল জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ৩.৩৯ কোটি যাত্রী ট্রেনে উঠতেই পারেননি, কারণ তাঁদের ‘ওয়েটিং লিস্ট’-এর টিকিট শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তরা অধিকাংশই ‘স্লিপার ক্লাস’, ‘এসি থ্রি টিয়ার’-এর যাত্রী। অর্থাৎ, তুলনামূলক ভাবে যাঁদের আর্থিক সঙ্গতি কম। ট্রেনে উঠতে না পারলে বিকল্প হিসাবে এঁরা সচরাচর বিমানে চাপার কথা ভাবতেও পারেন না। দূরপাল্লার বাস পরিষেবাও সর্বত্র সহজলভ্য নয়। ফলে, এঁদের উপরে যাত্রা বাতিলের অভিঘাত টিকিটের অর্থ ফেরত দিয়ে মেরামত করা যায় না। কেউ হারান সময়ে চিকিৎসার সুযোগ, কেউ কর্মক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়েন বা চাকরির সুযোগ খোয়ান, অসুস্থ নিকটজনের কাছে, ঘরে ফিরতে পারেন না কত জন।

উদ্বেগের বিষয় হল, টিকিট বাতিলের সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। ২০২০-২১ সালে ১.৬৫ কোটি যাত্রী এই দুর্ভোগের শিকার হয়েছিলেন, চার বছরেই দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী-পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হলেন। অর্থাৎ, যাত্রী-চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ট্রেনের সংখ্যা, আসনের পরিমাণ বাড়েনি। এই সময়কালের মধ্যে ট্রেন টিকিটের চাহিদা বৃদ্ধির অর্থনৈতিক কারণ স্পষ্ট— কাজের জন্য আন্তঃরাজ্য পরিযাণের প্রবণতা বেড়েছে। দেশের যে কোনও প্রান্তে কাজ করার অধিকার নাগরিকের রয়েছে— তার পরিবহণ পরিকাঠামোও সেই অধিকারেরই অঙ্গ। ট্রেনে টিকিট না পাওয়ার অর্থ, সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। এর জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে। মানুষ অস্বাস্থ্যকর ভাবে গাদাগাদি করে যাত্রায় বাধ্য হতে পারেন, বিনাটিকিটের যাত্রী বাড়তে পারে, হুড়োহুড়ি, বিপজ্জনক ভাবে দরজায় ঝোলা, দুর্ঘটনার ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের শঙ্কা থাকে। বৃদ্ধ ও শিশুর পক্ষে পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর, নারী-নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, ট্রেন বিলম্ব করলে ও দীর্ঘ যাত্রার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা অমানুষিক বলে প্রতিপন্ন হয়।

ভারতীয় রেল এখন ভবিষ্যতের পথে দৌড়তে মনস্থ করেছে— উচ্চ গতির ট্রেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ইত্যাদির কথা নিয়মিত শোনা যায়। এ কথাটি ঠিক যে, বৈশ্বিক মানে পিছিয়ে না পড়তে চাইলে দ্রুতগামী, অত্যাধুনিক রেলপরিষেবা দরকার। কিন্তু, মৌলিক পরিষেবাকে উপেক্ষা করে প্রকল্পগুলিকে শুধু বিমানযাত্রার বিকল্প বা অভিজাতের উপযুক্ত করে সাজানো কি নীতিসঙ্গত? বিশেষত, যে সব ‘আধুনিক পরিষেবা’ নিছক ব্যয়ের কারণেই দেশের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে, সেগুলির কথা ভাবতে গিয়ে কি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিহার্য পরিষেবাগুলির সঙ্গে সমঝোতা করা চলে? সমাধানের পথটি খুব জটিল নয়— আরও বেশি করে সাধারণ ট্রেন চালাতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৪৮টি বড় শহরে ট্রেন-পরিচালনার ক্ষমতা দ্বিগুণ করার ঘোষণাটি আশাপ্রদ হলেও স্টেশন সম্প্রসারণ ও লাইন প্রস্তুতির কাজের বাস্তবচিত্র অনুযায়ী এই গতিতে এই লক্ষ্যপূরণ কঠিন। গতি ও ভবিষ্যৎকেন্দ্রিক ভাবনাচিন্তার আগে প্রয়োজন যাত্রীর চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা। সাধারণ মানুষকে টিকিটের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা না দিতে পারলে গণপরিবহণকে সক্ষম বলা যায় না— আধুনিক বলার প্রশ্নই ওঠে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Express Trains Train Ticket Reservation ticket system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy