E-Paper

সভা ও সভ্যতা

দলগুলিকে বুঝতে হবে যে জনসভার আয়োজন মানে শুধু মঞ্চ নির্মাণ করে মানুষকে ডাক দেওয়া নয়, তার সঙ্গে ওই স্থানটির কোনও ক্ষতি না-করে সুব্যবহারের দায়িত্ববোধও জড়িত। অস্বীকার করা যায় না যে বড় সভার ক্ষেত্রে কিছু বিশৃঙ্খলা হওয়া সম্ভব।

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৭:১৭

নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। বিশাল জনসভা, উত্তেজনায় ভরা বক্তৃতা, রাজপথে জনতা, মিছিল— নিঃসন্দেহে বঙ্গের আগামী কয়েক দিনের ছবি। বৃহৎ জনসমাবেশগুলি নির্বাচনী গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এখানে মতের প্রকাশ ঘটে, জনসমর্থনের দাঁড়িপাল্লা বোঝা যেতে পারে, নেতার জনমোহিনী শক্তিরও পরীক্ষা হয়। কিন্তু এই ধরনের সমাবেশের পরের দিন যে ছবিগুলি প্রকাশ্যে আসছে ও সাধারণত আসে— তা অত্যন্ত অশোভনীয় ও লজ্জাজনক। বার বার দেখা যাচ্ছে যে, জনসভার পর মাঠময় পড়ে রয়েছে আবর্জনা, প্লাস্টিকের থালা, বোতল, কাপ ও উচ্ছিষ্ট; হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে ছেঁড়া ফেস্টুন। বর্ণ ও মতনির্বিশেষে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই পরিবেশ নষ্টের অভ্যাসটি সুচারু ভাবে আয়ত্তে রেখেছে, যা প্রকৃতপক্ষে অবহেলার সংস্কৃতি এবং জনজীবনে প্রভাব নিদারুণ। একে সামাজিক ব্যর্থতা রূপে দেখাই সমীচীন। ব্রিগেড-সহ মাঠ-ময়দানগুলি শহরের ফুসফুস, পরিবেশ ও ঐতিহ্যগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের নাগরিক পরিসরগুলিকে এ ভাবে আবর্জনার পাহাড়ে পরিণত করা অন্যায়।

দলগুলিকে বুঝতে হবে যে জনসভার আয়োজন মানে শুধু মঞ্চ নির্মাণ করে মানুষকে ডাক দেওয়া নয়, তার সঙ্গে ওই স্থানটির কোনও ক্ষতি না-করে সুব্যবহারের দায়িত্ববোধও জড়িত। অস্বীকার করা যায় না যে বড় সভার ক্ষেত্রে কিছু বিশৃঙ্খলা হওয়া সম্ভব। এত সংখ্যক মানুষ একত্রিত হলে বর্জ্যের উৎপত্তিও স্বাভাবিক। কিন্তু, সেই যুক্তিতে সেই বর্জ্য পরিষ্কারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া তো সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। সভা বা মিছিল-পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা ও দ্রুত ব্যবহারযোগ্যতা ফেরানোর মূল দায়িত্ব ও খরচ অবশ্যই সংশ্লিষ্ট নেতা ও আয়োজকদের। যদি কোনও উৎসব, সঙ্গীতানুষ্ঠান, খেলার পর আয়োজকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর নিয়ম মানতে বাধ্য থাকেন তবে রাজনৈতিক জনসভার ক্ষেত্রেও এই নিয়মই চলবে। আয়োজক এবং পুর-প্রশাসনিক সংস্থার মধ্যে সুসমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমেই এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব।

সমান গুরুত্বপূর্ণ হল, আগত জনতার মনোভাব। স্বেচ্ছাসেবক বা পুরকর্মীরা নোংরা পরিষ্কার করবেন— এই মানসিক জড়তা থেকেই কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, সতর্কতা ও পরিবেশ রক্ষার বিধি সত্ত্বেও এই বিশৃঙ্খলাকে স্বাভাবিক বলে মেনে চলা হচ্ছে। অনুষ্ঠান-শেষের পরিচ্ছন্নতার জন্য আগাম অর্থ জমা, পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে প্লাস্টিকের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ও কাপড়ের ফ্লেক্স ব্যবহার নিশ্চিত করা, খাবার ও জল সরবরাহের প্রকৃতিবান্ধব ব্যবস্থাপনা, এবং আবর্জনা রেখে গেলে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের আওতায় এনে শাস্তি ও জরিমানার বিধান থাকবে না কেন? নির্বাচনী প্রচারে দলগুলি উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, দক্ষ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির ঝুলি উজাড় করে, সেই প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও নাগরিক পরিসরের প্রতি তাদের আচরণও কিন্তু গভীর ব্যঞ্জনা বহন করে এবং সাংগঠনিক পটুত্ব, দক্ষতা, দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ইত্যাকার প্রকৃত স্বভাবকে চিনতে সহায়তা করে। দলগুলিকে জানতে হবে যে, যারা আধবেলার একটি আয়োজনের পরবর্তী আবর্জনা সামাল দিতে পারে না, তারা আগামী কয়েক বছর দেশ ও দশের জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে তো?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

garbage Social Awareness Environmental awareness Political Rally Brigade Rally Political parties

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy