পশ্চিমবঙ্গ শিহরিত— তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদামের সংবাদ জেনে, সেই ভয়ঙ্কর ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখে। কলকাতা মহানগরের বুকে যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, বিশ্বাস করাই যেন কঠিন। বলতেই হয়, সদ্যপ্রাক্তন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ‘কৃতিত্ব’ই আলাদা: একের পর এক শিহরন জাগানো ঘটনা নিয়মিত ভাবে জানান দিয়ে যাচ্ছে, সীমাহীন দুর্নীতি, নির্লজ্জ গুন্ডারাজ ও লাগামছাড়া বেআইনি কার্যক্রমে সেই সরকার রাজ্যকে কোন অতলে ডোবাতে বসেছিল। অন্তত ৪০ জন নির্মাণ-শ্রমিক এই ধ্বংসস্তূপে আটকে গিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্ভ্রান্ত বাঁচার আকুতি রাজ্যবাসীকে বাক্হীন করে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তদন্তের কথা জানিয়েছেন, তবে তদন্তের আগেই বলা যায় যে নির্মীয়মাণ কাঠামোর পরিকল্পনায় গুরুতর ত্রুটি ছিল বলেই এ-হেন নারকীয় ঘটনা ঘটতে পারল। বেশি দিন আগে নয়— মাত্র পাঁচ মাস আগে এই নির্মাণ পরিকল্পনায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। কত জনের মৃত্যু, কত জন গুরুতর আহত, তা জানার সঙ্গে আরও একটি সংখ্যা জানার দাবি রইল, রাজ্যবাসীর তরফে। পূর্বতন প্রশাসন ঠিক কত সংখ্যক নির্মাণ প্রকল্পে অর্থের বিনিময়ে কিংবা অন্যতর ‘লাভ’-এর বিনিময়ে সরকারি ছাড়পত্র দিয়েছিল। বড়বাজার থেকে খিদিরপুর, শহর জুড়ে কতগুলি এমন বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনা গত কয়েক বছরে ঘটেছে, হিসাব রাখাই ভার। তার সঙ্গে রয়েছে অগ্নিকাণ্ডের বিবিধ ঘটনা, কেননা অগ্নিসুরক্ষার ছাড়পত্র দানেও ছিল দেদার দুর্নীতি। ফলে কত নাগরিকের প্রাণ, কত পরিবারের জীবন এই সরকারি দুর্নীতিসুতোয় এখনও ঝুলছে, তা বুঝতেই নির্মীয়মাণ বাড়ির অডিট দরকার। সুখবর, ইতিমধ্যেই সেই অডিটের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বাস্তবিক, যে সিন্ডিকেট দুর্নীতির জন্য পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস শাসন এখন দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্তস্বরূপ ‘গুরুত্ব’ অর্জন করেছে, তার অভ্রান্ত স্বাক্ষর তারাতলার ঘটনায়। ওই অঞ্চলের সিন্ডিকেটের সদস্যদের দিয়েই এই কাজের পরিকল্পনা ও সম্পাদনা করানো হয়েছে, যাঁদের তরফে কোনও দায় বা দায়িত্বের প্রশ্নই ওঠে না, কেননা এঁরা পাশে পেয়েছেন রাজ্যের পূর্বতন শাসকের প্রকাশ্য সমর্থন। স্মরণীয়, বছর দুয়েক আগে গার্ডেনরিচে এমন ভাবেই বহুতল ভেঙে পড়ার পর স্থানীয় কাউন্সিলর অকুতোভয়ে নির্মাণ-সিন্ডিকেটকেই পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন, নিয়মনীতি ভাঙার তদন্তও আটকে গিয়েছিল। এই লভ্যাংশের ভাগ কত দূর ও কত উঁচু অবধি যেত, তা এখন আর অনুমানসাপেক্ষ নয়, প্রত্যক্ষ প্রমাণসিদ্ধ। সিন্ডিকেট রাজ উদ্ভূত গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে এ বারেরনির্বাচনে শাসকের পতন এবং মূলোচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ, তাও এত দিনে স্পষ্ট।
তারাতলার ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, রাজ্যের প্রতিটি ইঞ্চি এখন আইনের শাসন ফেরার অপেক্ষায় অধীর, সতৃষ্ণ। সে দিন যে ভাবে উদ্ধারকাজ চলেছে, তার থেকে আশা জাগে যে সেই শাসন এ বার হয়তো ফিরতে চলেছে। সেনা, সিভিল ডিফেন্স, দমকল, পুলিশ, পুরসভা যে ভাবে একযোগে কাজ করেছে, তা বিশেষ প্রশংসার্হ। পূর্বতন সরকারের আমলে দুর্ঘটনা ঘটার পর পরিস্থিতির মোকাবিলাতেও বারংবার দেখা গিয়েছে বহুবিধ ত্রুটি, কখনও দমকলের অপ্রস্তুতি, কখনও সেনার অনুপস্থিতি। আশা করা যায়, নতুন সরকারের নতুনত্বের রেশ কাটার পরও এই পরিমাণ উদ্যোগ ও উদ্দীপনা নিয়েই আপৎকালীন প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন হবে। এও আশা রইল যে, বহু মানুষের জীবন নিমেষে সঙ্কটাপন্ন করার অক্ষমণীয় অপরাধের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের উপযুক্ত শাস্তি বিধান হবে। নানাবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব এসে আবারও ন্যায় ও নৈতিকতার যুক্তিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না। সিন্ডিকেট রাজের মূলোৎপাটন ছাড়া রাজ্যের উন্নয়ন কেন, নিরাপদ সমাজ জীবনের দিকেও অগ্রসর হওয়া অসম্ভব।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)