মণিপুরে রক্তক্ষয়ী গোষ্ঠী-সংঘর্ষের তিন বছর পেরোল গত মে মাসে। এর মধ্যে পাল্টে গিয়েছে বহু মণিপুরবাসীর জীবন; মেইতেই, কুকি, নাগা-সহ সব গোষ্ঠীরই— অগণিত মানুষের দিন কাটছে ত্রাণ শিবিরে, সরকারের বন্দোবস্ত করে দেওয়া স্থায়ী বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। তথ্যের অধিকার আইনে সম্প্রতি মণিপুরের এক লেখক-সমাজকর্মীর আবেদনের প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার প্রদত্ত তথ্যে জানা গেল, এই তিন বছরে চূড়াচাঁদপুর, বিষ্ণুপুর, কাংপোকপি, ইম্ফল পূর্ব ও পশ্চিম-সহ নয়টি জেলার ত্রাণ শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে মারা গেছেন মোট ৭৩১ জন মানুষ। এঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী কী, আবেদনকারীর এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর বা ব্যাখ্যা অবশ্য মেলেনি। তবে জেলা প্রশাসনসূত্রে চয়িত তথ্য বলছে, ত্রাণ শিবিরগুলিতে ২৮৭ জন মানুষ জীবনান্তক রোগব্যাধিতে ভুগছিলেন। পঁচিশ জনের মৃত্যু ‘অস্বাভাবিক’: জলে ডুবে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে যেমন, তেমনই ঘটেছে আত্মহনন, যৌন নিগ্রহ, অতিরিক্ত মাদক সেবন, গুলিতে নিহত হওয়ার মতো ঘটনাও।
যে কোনও নাগরিক-মৃত্যুই দুঃখজনক। তবে যুদ্ধ বা যুদ্ধ-পরিস্থিতি, গৃহযুদ্ধ, গোষ্ঠী-সংঘর্ষের জেরে অগণিত নাগরিক যে উচ্ছিন্নতা তথা ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’-এর শিকার হন, কোনও ত্রাণ শিবির বা আশ্রয়কেন্দ্রই তার উপশম হয়ে ওঠে না— তার সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে ইতিহাসেই। যুদ্ধ বা দেশভাগের জেরে উদ্বাস্তু মানুষের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদ এখন আলাদা করে বলছে ‘আইডিপি’ বা ‘ইন্টার্নালি ডিসপ্লেসড পারসন’দের দুর্দশার কথা— নিজভূমেই ছিন্নমূল, স্থানান্তরিত যাঁরা; এই মুহূর্তে মণিপুরের ত্রাণ শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রে বাসরত ৪৩ হাজারেরও বেশি মেইতেই-কুকি-জ়ো-মার তথা মণিপুরি নাগরিকেরা যাঁদের উদাহরণ। দুর্ঘটনায় বা বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু তবু এক রকম, কিন্তু যৌন নিগ্রহ, মাদকাসক্তি থেকে শুরু করে আত্মহননে মৃত্যুই প্রমাণ— ত্রাণ শিবিরের বাসিন্দাদের শরীর ও মনের অবস্থা কেমন থাকে। মণিপুরের ত্রাণ শিবিরে কাজ করা নাগরিক গোষ্ঠী ও মানবাধিকার-কর্মীদের তথ্যে উঠে এসেছে এই মানুষদের মানসিক যন্ত্রণা ও ‘ট্রমা’র কথা; চার বছর আগেও যে মানুষটি সবল ও নীরোগ ছিলেন, ত্রাণ শিবিরে আকস্মিক হৃদ্রোগে তাঁর মৃত্যুর কথা, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ুরোগ, মানসিক অবসাদ-সহ নানা ব্যাধির কথা। ভয়, অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, নিজের ঘরে ফিরতে না পারার যন্ত্রণা যে মৃত্যুর কারণ হতে পারে, সরকারি তথ্য কি তার খবর রাখে?
এই অগণিত নাগরিক-মৃত্যুর দায় কার? মণিপুরে রক্তক্ষয়ী গোষ্ঠী সংঘর্ষের তিন বছর অতিক্রান্ত, প্রায় এক বছর রাষ্ট্রপতি শাসনের পর এই ফেব্রুয়ারিতে ইয়ুমনাম ক্ষেমচাঁদ সিংহের সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী ও দুই উপমুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মেইতেই, কুকি ও নাগা তিন প্রধান গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার পন্থাটি দৃশ্যমান। বাস্তবচিত্র ভিন্ন: এক দিকে মেইতেই-কুকি, অন্য দিকে কুকি-নাগা বিরোধ এখনও মেটেনি, সম্প্রতি কয়েকটি জায়গায় আবার হিংসার ঘটনা ঘটেছে। সার্বজনিক মণিপুরি ঐক্যের লক্ষ্যে নতুন রাজ্য সরকার মন দিক, কেন্দ্র সক্রিয় ও সদিচ্ছভাবে তার পাশে দাঁড়াক, নাগরিক গোষ্ঠীগুলির এ-হেন আবেদনেও সাড়া মিলছে না। ত্রাণ শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে যন্ত্রণাময় নাগরিক-মৃত্যুর খতিয়ান বেড়েই চলবে, রাষ্ট্র কি এ-ই চায়?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)