E-Paper

নিষেধাজ্ঞার ফল

লান্সেট-এ প্রকাশিত (২০২৪) একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায় যে নিয়মিত মদ্যপান কমায় বিহারে পুরুষদের ওজনবৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবিটিসের হার কমেছে।

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ০৭:০৭

নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে আর এক বার ভাবার অবকাশ তৈরি করল বিহার। সে রাজ্যে মদের উপর নিষেধাজ্ঞা এক দশক পার করল। মদ্যপানের হার আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে, কিন্তু দেখা দিয়েছে অন্যান্য সঙ্কট— অবৈধ মদের রমরমা, বিষ মদে স্বাস্থ্যহানি, গাঁজা, তামাক, কাফ সিরাপের মতো নেশাদ্রব্যে আসক্তির বৃদ্ধি। অতএব লাভ হয়েছে না ক্ষতি, সে প্রশ্নের কোনও সিধে উত্তর দেওয়া সহজ নয়। ২০১৬ সালে নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বিহারে মদ তৈরি, মজুত, বিক্রি এবং মদ্যপানের উপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তার আগে অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরল, হরিয়ানা প্রভৃতি নানা রাজ্যে নানা সময়ে মদের উপর সার্বিক বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে, আবার প্রত্যাহারও হয়েছে। বৈধ মদ বন্ধ করায় অবৈধ মদের কারবার বেড়ে যাওয়া, বিষমদে অসুস্থতা ও মৃত্যু প্রভৃতিকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন শাসকরা। আরও বড় সত্যটি সম্ভবত এই যে, মদ থেকে রাজ্যের সরকারগুলি যে বিপুল রাজস্ব আয় করে, তার ক্ষতি বেশি দিন সামাল দেওয়া সহজ হয়নি। তাই বিহারে মদ নিষিদ্ধ করার ফল কী হয়, তা নিয়ে সারা দেশেরই কৌতূহল ছিল। ষষ্ঠ জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০২৩-২৪)-র ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর যে ছবিটি সামনে আসছে, তা সাদা-কালো নয়, ধূসরের নানা মাত্রায় আঁকা। নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল মদে আসক্তি কমিয়ে পুরুষদের স্বাস্থ্যে উন্নতি, পারিবারিক অর্থের অপচয় রোধ, নারী-নির্যাতন প্রতিরোধ। মদের নেশা যে গার্হস্থ হিংসার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, নানা সমীক্ষাতে তা প্রমাণিত। তাই মদে নিষেধাজ্ঞা বিহারের মেয়েদের বিপুল সমর্থন পেয়েছিল।

পঞ্চম জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯-২১)-র তথ্য থেকে বিশেষজ্ঞরা নানা লাভের ইঙ্গিত পান। লান্সেট-এ প্রকাশিত (২০২৪) একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায় যে নিয়মিত মদ্যপান কমায় বিহারে পুরুষদের ওজনবৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবিটিসের হার কমেছে। গার্হস্থ হিংসা প্রতিরোধের প্রত্যাশাও খানিকটা পূর্ণ হয়েছে— ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০১৯-২১ সালে গর্ভবতী মেয়েদের উপর হিংসা হ্রাসের হারে বিহার এগিয়ে ছিল উত্তরপ্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে। সর্বোপরি, মদ্যপান করছে, এমন পুরুষ ৩০ শতাংশ থেকে কমে গিয়েছিল ১৭ শতাংশে। ২০২৩-২৪ সালে দেখা যাচ্ছে, মদ্যপানের হার গত পাঁচ বছরে সামান্য বেড়েছে, কিন্তু আসল সমস্যা অন্যত্র— বেশি টাকা দিয়ে বিপজ্জনক মদ খাচ্ছেন পুরুষরা। মদ নিষেধের পর তামাক, গাঁজা প্রভৃতির পিছনে গ্রামের মানুষের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দশ বছরে পারিবারিক হিংসা কমেছে, কিন্তু তা এখনও জাতীয় গড়ের (২২ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি (৩৬ শতাংশ)। গার্হস্থ হিংসা কমার পিছনে মদ নিষেধের ভূমিকা কতখানি, সে প্রশ্নও উঠেছে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে যে লাভগুলি নজর কেড়েছিল, দীর্ঘমেয়াদে সেগুলির পাশাপাশি ক্ষতির ছবিও ফুটে উঠছে।

হিসাবে এসেছে রাজস্বে ক্ষতিও। ২০১৫-১৬ সালে বিহারের রাজস্ব ছিল তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৬-১৭ সালে তা নেমে আসে মাত্র ত্রিশ কোটি টাকায়। অন্যান্য খাতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়িয়েও মদ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ঘাটতি পূরণ করা যায়নি, কেন্দ্রের উপর বিহারের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। বেড়েছে মামলার চাপ। বিভিন্ন আদালতে চার লক্ষেরও বেশি অবৈধ মদ সংক্রান্ত মামলা জমে রয়েছে। রয়েছে গণতন্ত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও। তাই নিষেধাজ্ঞা রদের পক্ষে সওয়াল উঠছে। অথচ, নিষেধাজ্ঞার সুফলও স্পষ্ট। নানা সমীক্ষায় মেয়েরা জানিয়েছেন, মদ বন্ধ হওয়ায় তাঁদের জীবনের মান উন্নত হয়েছে, সন্তানের পড়াশোনায়, খাদ্যে বেশি খরচ করতে পারছেন। মদে আসক্তির সঙ্কট মোকাবিলা করতে হয় সব রাজ্যকে। বিহারের ছবিটি তাই মন দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য, নারীসুরক্ষার গুরুত্বকে সামনে রেখে মদ নিয়ন্ত্রণে নমনীয়, কার্যকর নীতির কথা ভাবা দরকার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bihar Nitish Kumar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy