E-Paper

ইতিহাসের অছিলায়

বস্তুত, চুক্তির পক্ষে তাদের দাবিকে আরও জোরালো করতে ইতিহাসের সাহায্য নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে পাকিস্তান।

শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ০৭:০৮

জল নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে পুনরায় সরব পাকিস্তান। সম্প্রতি সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সতর্ক করেছেন যে, ভারতের কারণে তাঁদের জল নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ন্যূনতম আঁচ মিললে, ইসলামাবাদ সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করবে। মন্তব্যটি করা হয় ভারতের জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাটিলের একটি ভিডিয়োর সূত্রে যেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ২০২৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানে সিন্ধু নদের জলপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। গত বছর পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর থেকেই সিন্ধু জল বণ্টন চুক্তি স্থগিত রেখেছে ভারত। তাদের দাবি, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করলে, জল চুক্তির বিষয়ে কোনও রকম সহযোগিতা করা হবে না। এর পর থেকেই পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ ও যুদ্ধসদৃশ কর্মকাণ্ড’ হিসেবে নিন্দা করে আসছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের বিরুদ্ধে এই বিষয়ে সরব হয়েছে তারা। খাজা আসিফ নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে ‘জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’, নদীর জলের প্রবাহে কারসাজি এবং তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলেছেন।

বস্তুত, চুক্তির পক্ষে তাদের দাবিকে আরও জোরালো করতে ইতিহাসের সাহায্য নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। যে-হেতু সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবেশেষের একটি বড় অংশ সে দেশে অবস্থিত, সেই সূত্রে রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রামাণ্যচিত্র, সম্মেলন এবং আন্তর্জাতিক প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সিন্ধু সভ্যতাকে পাকিস্তানের পরিচয়ের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই প্রচেষ্টায় মদত দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতারাও। গত বছর পহেলগাম সন্ত্রাসবাদী হামলার জেরে ভারত সিন্ধু জল বণ্টন চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তের পরই পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)-র প্রধান বিলাবল ভুট্টো-জারদারি এক জনসভায় মহেঞ্জোদরো এবং সিন্ধু সভ্যতার প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, সিন্ধু নদের ‘প্রকৃত অভিভাবক’ হল পাকিস্তানই। এই পরিচয়ের সুবাদেই ‘রক্ষক’ হিসেবে এই নদীর উপর পাকিস্তানের ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে। লক্ষণীয়, সিন্ধু জল চুক্তির মতো সৃষ্ট বিরোধের ক্ষেত্রে আইনি যুক্তিগুলি প্রায়শই কঠোর কারিগরি শর্ত ও জল বণ্টনের সুনির্দিষ্ট নিয়মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। এমতাবস্থায় সভ্যতা-কেন্দ্রিক বয়ান বা প্রেক্ষাপট যুক্ত করার মাধ্যমে পাকিস্তান তাদের দাবির পরিধিকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছে— এর ফলে প্রথাগত জল-অধিকারের বিষয়টি এতে যেমন অন্তর্ভুক্ত হয়, তেমনই নদীর নিম্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বাস্তুতান্ত্রিক চাহিদাকেও বিবেচনাধীন করে তোলা যায়।

তবে কিনা আন্তর্জাতিক জল আইন অনুযায়ী, আন্তঃসীমান্ত জলের অধিকার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা ঐতিহাসিক ও সভ্যতাকেন্দ্রিক দাবির পরিবর্তে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত আইনি চুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রথাগত নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সুতরাং, সিন্ধু সভ্যতার প্রসঙ্গ উত্থাপন হয়তো পাকিস্তানের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এবং বিদেশে কিছুটা সহানুভূতি অর্জনে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এটি এই বিরোধ-সংক্রান্ত আইনি বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না। সময়ের সঙ্গে যে কোনও চুক্তিরই পর্যালোচনার প্রয়োজন পড়ে। শেষ পর্যন্ত এই বিরোধের নিষ্পত্তি নদীর অবস্থা এবং দুই দেশের সহযোগিতার সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pakistan Indus Valley Civilization

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy