E-Paper

সুখের সময় নয়

দুই বাংলাতেই এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বিভেদকামী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। উল্লেখ্য যে, গত আট দশকের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এমন রমরমা দেখা যায়নি।

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩৪

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গেও যেন এক বিরাট স্বস্তির শ্বাস। একটি জানা কথা এতদ্দ্বারা আবার নতুন করে জানা গেল। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুই দেশ হয়ে গেলেও এ-পার বাংলা এবং ও-পার বাংলার মধ্যে এখনও নাড়ির টান যথেষ্ট অনুভবযোগ্য, এবং গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ যে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী থেকেছে, তার উদ্বেগ, যন্ত্রণা ও আশঙ্কা ছুঁয়ে থেকেছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকেও। অনুমান করা যায়, উল্টো ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটত। বাংলাদেশের মানুষও পশ্চিমবঙ্গের বিপন্নতায় উদ্বিগ্ন হতেন। কেবল হিন্দু-মুসলমান, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরুর হিসাবে এই উদ্বেগের ব্যাখ্যা কেবল অসম্পূর্ণ নয়, ভুল। বাংলা ভাষাভাষী সমাজের মধ্যে সদাবহমান এই নাড়ির টানের মধ্যে তো কেবল ধর্মগত বা রাষ্ট্রগত যোগ-বিয়োগ নেই, তার থেকে বেশি কিছু আছে। যত বেশি এই কথা স্বীকার করে নেওয়া যাবে, ভারতের বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালি, উভয়ের পক্ষেই তা মঙ্গলদায়ক হবে। নির্বাচনী ফলাফল জানার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বভাবসিদ্ধ ‘শুভনন্দন’ বার্তার অর্থ যা-ই হোক, দুই দেশের মধ্যে অতিরিক্ত শত্রুভাব এবং ধর্মবিভেদের প্রয়াস যাঁরা করেন, তাঁদের পিছনে সরিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতায় সামনে এগোনোই একমাত্র ‘শুভ’ সঙ্কল্প হতে পারে। দুই বাংলাকেই অনেক রক্তের বিনিময়ে এই সত্যের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে, সে কথা বিস্মৃত না-হওয়াই কর্তব্য।

আরও বেশি করে এই কর্তব্য পালন জরুরি, কেননা দুই বাংলাতেই এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বিভেদকামী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। উল্লেখ্য যে, গত আট দশকের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এমন রমরমা দেখা যায়নি। বিজেপি ইতিমধ্যেই এই বাংলায় প্রধান বিরোধী দল, এবং শাসক দল হতে তারা অত্যাগ্রহী। একই ভাবে, স্বাধীনতার পর, গত পাঁচ দশকের মধ্যে এখনই বাংলাদেশে কট্টরপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা— এ বার তারা ভোটে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে, এবং অভূতপূর্ব ভাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসন জিতেছে।স্মরণীয়, ২০১৯ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দ্রুতবেগে উত্থানের কাহিনি। ধর্মীয় পরিচয় যে প্রধানত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনীতি যে ধর্মকে ঘিরে ঘুরলে তা সঙ্কীর্ণ ও বিদ্বেষবর্ষী মানসিকতার আখড়া হয়ে ওঠে, তা এখন আরও বেশি করে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সময়, সীমান্তের দুই দিকেই।

ইতিহাস সাক্ষী, সীমান্তের এক দিকে অসহিষ্ণুতা উগ্র হয়ে উঠলে অন্য দিকেও তা দ্রুত প্রসারিত হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট, কেন সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতেই জামায়াতে ইসলামী বেশি পরিমাণে জয় লাভ করেছে, কেন সেখানেই তাদের দখল সর্বাপেক্ষা বেশি। পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবও যেন এর আয়না-প্রতিফলন। সেই জন্য সীমান্ত অঞ্চলেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বেশি, ধর্মীয় রাজনীতির প্রকোপও অধিক। বাংলাদেশের এই বারের নির্বাচনের সুস্পষ্ট বার্তা সেই ক্ষেত্রটিতেই— সে দেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দল এই প্রথম সেখানে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবিষ্ট এবং প্রোথিত হল। বার্তাটি সুখের নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

India-Bangladesh West Bengal government Bangladesh Religious Politics Communalism

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy