প্রয়াত প্রবীণ প্লেব্যাক শিল্পী সুমন কল্যাণপুর। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। জানা গিয়েছে, রবিবার লোখান্ডওয়ালায় তাঁর বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত কারণে সুমনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত সঙ্গীতজগৎ।
সুমনের মৃত্যুতে এনসিপি (এসপি) নেতা শরদ পাওয়ার এক্স হ্যান্ডলে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি লেখেন, “প্রবীণ প্লেব্যাক গায়িকা সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণ সংবাদ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তাঁর মিষ্টি, সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ দিয়ে তিনি ভারতীয় সঙ্গীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন।”
১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় সুমনের জন্ম। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবথেকে বড়। ১৯৪৩ সালে বাবা শঙ্কর রাও হেমাডি ও মা সীতা চলে আসেন তৎকালীন বম্বে শহরে। সেখানেই বেড়ে ওঠা সুমনের।
গায়িকা হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। বরং, ছোটবেলায় ভাল লাগত ছবি আঁকতে, সেলাই করতে আর বাগানের যত্ন নিতে। আঁকার শখ বজায় ছিল জীবনের পরবর্তী পর্বেও। সেই শখের জন্যই সাবেক বম্বের সেন্ট কোলাম্বা স্কুলের পরে সুমন ভর্তি হন স্যর জেজে স্কুল অব আর্টসে। কৈশোরে ভাল লাগতে শুরু করে নূরজাহানের গান। স্কুলে বা বাড়ির অনুষ্ঠানে গান গাইতেন সুমন। সেরকমই এক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শোনেন প্রখ্যাত মরাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনি কথা বলেন সুমনের বাবা-মায়ের সঙ্গে। মেয়ের প্রতিভাকে নষ্ট না করার অনুরোধ করেন। নিজেই সুমনকে তালিম দিতে শুরু করেন তিনি। কেশবরাও বুঝেছিলেন সুমনের গলা লাইট মিউজিকের জন্য আদর্শ। তাঁর পরামর্শেই লাইট মিউজিকে মনোনিবেশ করেন সুমন।
১৯৫২ সালে আকাশবাণীতে প্রথম গান গেয়েছিলেন তিনি। হিন্দি সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক ১৯৫৪ সালে ‘মাঙ্গু’ ছবিতে। শঙ্কর জয়কিষণ, রোশন, মদনমোহন, শচীনদেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ওপি নায়ার, নৌশাদ, প্রমুখ সব নামী সঙ্গীত পরিচালকের নির্দেশনায় কাজ করেছেন তিনি। মহম্মদ রফি সহ-শিল্পী ছিলেন। রফি ও সুমন প্রায় ১৪০টি ডুয়েট করেন। তাঁদের ডুয়েটের মধ্যে ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’, ‘না না কর কে প্যায়ার’-এর মতো গান রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ডুয়েট করেছেন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও।
আরও পড়ুন:
পাঁচ থেকে সাতের দশক অবধি হিন্দি ছবিতে সুমন একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়েছেন। বিখ্যাত ছবিগুলির মধ্য রয়েছে— ‘বাত এক রাত কি’, ‘দিল এক মন্দির’, ‘নূরজাহান’, ‘দিল হি তো হ্যায়’, ‘জাহান আরা’, ‘পাকিজ়া’, ইত্যাদি। বাংলা গানও গেয়েছেন প্রচুর। ‘মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গেছে’ (কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুর রতু মুখ্যোপাধ্যায়), ‘আমার স্বপ্ন দেখার দু’টি নয়ন’ (কথা মুকুল দত্ত এবং সুর রবিন বন্দ্যোপাধ্যায়)।
লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সুমনের কণ্ঠস্বরের মিল ছিল। অনেক সময় তুলনাও হয়েছে। এ রকম হয়েছে, সুমনের গান পরিচিত হয়েছে লতার গান বলে। সুমন জানিয়েছিলেন, কিংবদন্তি শিল্পী লতা তাঁর প্রিয় শিল্পী। কিন্তু তিনি কোনওদিন তাঁকে ইচ্ছাকৃত ভাবে অনুকরণ করেননি।
সুমনের ধ্রুপদী গানের রেকর্ড বিরল। কিন্তু ধ্রুপদী গানেও তাঁর ছিল অনায়াস বিচরণ। হিন্দি ছবিতে রাগাশ্রয়ী গানের জন্য তিনি তিন বার ভূষিত হন ‘সুর শ্রীনগর সংসদ’ সম্মানে। ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে সম্মানিত করে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কারে’। ২০২৩ সালে ভারত সরকারের পদ্ম ভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন তিনি।