একেই হয়তো বলে চ্যাম্পিয়নের মতো খেলা। ফাইনাল প্রতিপক্ষ গুজরাত টাইটান্সের ঘরের মাঠে হচ্ছিল, না বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে, তা দেখে বোঝার উপায় ছিল না। হয়তো বিরাট কোহলির জন্যই ১ লক্ষ ১০ হাজার দর্শকের মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ বেঙ্গালুরুর সমর্থক ছিলেন। যত খেলা গড়াল, অহমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের শব্দব্রহ্ম বাড়ল। দর্শকদের মাতিয়ে দিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। পর পর দু’বার চ্যাম্পিয়ন হল তারা। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ও রোহিত শর্মাকে ছুঁয়ে ফেললেন কোহলি। তিনিও পর পর দু’বার চ্যাম্পিয়ন হলেন। ফাইনালে দেখা গেল ‘চেজ়মাস্টার’ কোহলিকে। তাঁর ব্যাটেই জিতল বেঙ্গালুরু।
১৫৬ রান তাড়া করতে নেমে বেঙ্গালুরু কেমন শুরু করে সে দিকে নজর ছিল সকলের। লক্ষ্য কম থাকলেও খেলার ধরন বদলায়নি বেঙ্গালুরু। শুরু থেকে আক্রমণের পথে হাঁটেন কোহলি ও বেঙ্কটেশ আয়ার। দু’বছর আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে প্রথম কোয়ালিফায়ার ও ফাইনালে অর্ধশতরানের ইনিংস খেলেছিলেন বেঙ্কটেশ। এ বার শুরু থেকে বেঙ্গালুরুর প্রথম একাদশে সুযোগ পাননি। মাঝে দু’টি ম্যাচে সুযোগ পান। ভালই খেলেন। প্লে-অফে তাঁকে ওপেনার হিসাবে খেলায় বেঙ্গালুরু। প্রথম কোয়ালিফায়ারে ভাল শুরু দিয়েছিলেন। ফাইনালেও সেটাই করলেন তিনি।
প্রথম ওভারেই মহম্মদ সিরাজের বল হাঁটুতে লাগে বেঙ্কটেশের। চোট পান তিনি। খোঁড়াচ্ছিলেন বাঁহাতি ব্যাটার। তখনই তিনি ঠিক করে নেন, আগ্রাসী ব্যাটিং করবেন। একের পর এক শট খেলতে শুরু করেন। দ্রুত রান তুলতে শুরু করেন। ঝুঁকি নিয়ে খেলছিলেন। সেই ঝুঁকি কাজে লাগে। কোহলি প্রথমে একটু সময় নিলেও কাগিসো রাবাডার এক ওভারে হাত খোলেন। মারেন তিনটি চার ও একটি ছক্কা। সেই শুরু। আর থামানো গেল না তাঁকে। দুই ওপেনার মাত্র ৩.৩ ওভারে ৫০ রানের জুটি গড়েন।
বেঙ্গালুরুর এই ভাল শুরুর নেপথ্যে গুজরাতের দুই পেসার সিরাজ ও রাবাডার খারাপ পরিকল্পনাও দায়ী। লক্ষ্য কম থাকায় তাঁরা শুরু থেকে উইকেট নেওয়ার জন্য একটু বেশিই চেষ্টা করেন। সব রকম বল করেন। একটি নির্দিষ্ট লেংথে বল করছিলেন না তিনি। সেটা করতে গিয়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ খারাপ হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগায় বেঙ্গালুরু।
অবশেষে সেই সিরাজই বেঙ্গালুরুকে প্রথম ধাক্কা দেন। তাঁর বলে আউট হন বেঙ্কটেশ। ১৬ বলে ৩২ রান করেন তিনি। রান পাননি দেবদত্ত পড়িক্কল। ১ রানের মাথায় রাবাডার বলে আউট হন তিনি। সিরাজকে দিয়ে টানা চার ওভার বল করান শুভমন। ২ উইকেট পড়লেও পাওয়ার প্লে-তে ৭০ রান করে বেঙ্গালুরু। ১৫৬ রান তাড়া করতে নেমে পাওয়ার প্লে-তেই জয়ের ভিত গড়ে নেয় বেঙ্গালুরু।
উইকেট নেওয়ার জন্য দলের সেরা অস্ত্র রশিদ খানের হাতে বল তুলে দেন শুভমন গিল। অধিনায়ককে ভরসা দেন রশিদ। প্রথমে অধিনায়ক পাটীদারকে আউট করেন তিনি। রশিদের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে লং অনে ক্যাচ আউট হন পাটীদার। ১৫ রান করেন বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক। জিতেশ শর্মাকে না নামিয়ে পাঁচ নম্বরে ক্রুণাল পাণ্ড্যকে নামায় বেঙ্গালুরু। গত বারের ফাইনালে তিনিই ছিলেন ম্যাচের সেরা। কিন্তু এই ম্যাচে পারলেন না। রশিদের বলে ১ রানের মাথায় আউট হন তিনি। এক ওভারে জোড়া উইকেট নিয়ে দলকে খেলায় ফেরান আফগান স্পিনার।
চার উইকেট পড়লেও যত ক্ষণ কোহলি ক্রিজ়ে ছিলেন তত ক্ষণ স্বস্তি পাচ্ছিলেন না শুভমন। কারণ, তিনি ‘চেজ়মাস্টার’। কী ভাবে রান তাড়া করতে হয়, তা তাঁর থেকে ভাল কেউ জানেন না। মনের মধ্যেই হিসাব চলে তাঁর। কোন বোলারকে নিশানা করবেন, কোথায় শট খেলবেন, তা আগে থেকে ঠিক থাকে। সেটাই করে দেখালেন তিনি। তাঁকে আউট করতে না পারার খেসারত দিতে হল গুজরাতকে। ১০ ওভারে ১০০ পূর্ণ হয় বেঙ্গালুরুর। বাকি ১০ ওভারে দরকার ছিল ৫৬ রান।
২৫ বলে অর্ধশতরান করেন কোহলি। আইপিএলের ১৯ বছরের ইতিহাসে এটি তাঁর দ্রুততম শতরান। বোঝা যাচ্ছিল, চ্যাম্পিয়ন হতে কতটা মরিয়া তিনি। গ্যালারিতে আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহের পাশে বসেছিল বৈভব সূর্যবংশী। তার দল রাজস্থান রয়্যালস ফাইনালে না উঠলেও কমলা টুপি-সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার পাবে বৈভব। তাই এসেছিল সে। গ্যালারিতে বসে কোহলির ইনিংস দেখল বৈভব। বুঝতে পারল, কী ভাবে ঠান্ডা মাথায় দলকে জেতাতে হয়।
পঞ্চম উইকেটে কোহলির সঙ্গে জুটি বাঁধেন টিম ডেভিড। কয়েকটি বড় শট মেরে কোহলির কাজ সহজ করে দেন তিনি। কোহলি জানতেন, বলের থেকে প্রয়োজনীয় রান কম। তিনি সময় নিতে পারবেন। ২৪ রান করে আরশাদ খানের বলে আউট হন ডেভিড। কিন্তু তত ক্ষণে জয়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে বেঙ্গালুরু। বাকি রান করেন কোহলি ও জিতেশ। এক বারই সুযোগ দিয়েছিলেন কোহলি। ৬৩ রানের মাথায় তাঁর কঠিন ক্যাচ ধরতে যান শুভমন। আম্পায়ার প্রথমে আউট দিয়েও দেন। কিন্তু কোহলি মানতে চাইছিলেন না। শুভমনও নিশ্চিত ছিলেন না। রিপ্লেতে দেখে বোঝা যায়, বল মাটি ছুঁয়েছে। জীবন পান কোহলি। তাঁর মুখের হাসি বুঝিয়ে দেয়, তিনিই ঠিক বুঝেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১২ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বেঙ্গালুরু। কোহলি ৪২ বলে ৭৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। ছক্কা মেরে দলকে জেতান তিনি।
আরও পড়ুন:
গুরুত্বপূর্ণ এই ফাইনালে টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন পাটীদার। সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা ঠিক, তা বুঝিয়ে দেন বেঙ্গালুরুর পেসারেরা। চলতি আইপিএলে গুজরাতের প্রায় ৬০ শতাংশ রান করেছেন শুভমন ও সাই সুদর্শন। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে এই দু’জনের ব্যাটেই জিতেছে গুজরাত। ফলে ফাইনালেও দলকে ভাল শুরু করার দায়িত্ব ছিল এই দু’জনের কাঁধেই। সেটা ভাল ভাবে জানতেন বেঙ্গালুরুর বোলারেরা। ফলে দুই ব্যাটারের বিরুদ্ধে অন্য পরিকল্পনা করে নেমেছিলেন তাঁরা। সেটা কাজে লাগল।
হেজ়লউড বা ভুবনেশ্বর সাধারণত লেংথ বল করেন। সুইং করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ফাইনালের পিচে বেশি সুইং ছিল না। তাই দুই বোলারই শর্ট বলের উপর ভরসা করলেন। সেই শর্ট বলই তাঁদের সাহায্য করল। হেজ়লউডের বলে পুল মারতে গিয়ে ১০ রান করে আউট হলেন শুভমন। সেই বলটি পুল মারার বল ছিল না। শট নির্বাচনে ভুল করেন শুভমন। ভাল ক্যাচ ধরেন অধিনায়ক রজত পাটীদার। সুদর্শন আবার ভুবনেশ্বরের বাউন্সার সামলাতে পারেননি। ক্যাচ তোলেন। সেই ক্যাচটিও ভাল ধরেন জিতেশ শর্মা। ১২ রানে আউট হন সুদর্শন।
নিশান্ত সিন্ধু ও বাটলার দলের ইনিংস ধরার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বেশি ক্ষণ টেকেনি সেই জুটিও। রাসিখ দারের বলে বড় শট মারতে গিয়ে আউট হন নিশান্ত। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পর ছ’ওভার একটিও বাউন্ডারি মারতে পারেননি গুজরাতের ব্যাটারেরা। রান তোলার গতি কমছিল। ফলে চাপ বাড়ছিল। বাধ্য হয়ে ক্রুণালের বল বেরিয়ে খেলার চেষ্টা করেন বাটলার। ক্রুণাল বুদ্ধি করে বাটলারের থেকে দূরে বল করেন। বাটলার বলে ব্যাট লাগাতে পারেননি। স্টাম্প আউট হন তিনি। ২৩ বল খেলে ১৯ রান করেন তিনি।
ওয়াশিংটন সুন্দরও তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যেতেন। জেকব ডাফির বাউন্সার সামলাতে না পেরে তিনিও ক্যাচ তোলেন। ফাইন লেগে ক্যাচ ধরেন জর্ডন কক্স। কিন্তু বল ধরার পর তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে বল মাটিতে লাগে। ফলে বেঁচে যান তিনি। আরশাদ খানকে ছ’নম্বরে নামিয়ে ফাটকা খেলতে চেয়েছিল গুজরাত। তিনি নেমে দু’টি ছক্কাও মারেন। কিন্তু ১৫ রানের মাথায় হেজ়লউডের বাউন্সারে তিনিও আউট হন।
গুজরাতকে সম্মানজনক রানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল ওয়াশিংটন ও রাহুল তেওতিয়ার উপর। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রান পেলেন না তেওতিয়া। রাসিখ দারের বলে ৭ রানের মাথায় আউট হন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল, ১৫০ রান করতেও সমস্যা হবে গুজরাতের।
ওয়াশিংটন অবশ্য তখনও ক্রিজ়ে ছিলেন। এক বার ক্যাচ পড়ার পর তিনি ভাল খেলছিলেন। অন্তত বড় শট মারার চেষ্টা করছিলেন। তাতে সফলও হচ্ছিলেন। হেজ়লউডের শেষ ওভারে আসে ১৬ রান। কিন্তু অপর প্রান্তে উইকেট পড়ছিল। জেসন হোল্ডার, রশিদ খান তাঁকে সঙ্গ দিতে পারেননি। ফলে একাই লড়লেন তিনি। করলেন অর্ধশতরান।
শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৫৫ রানে শেষ হয় গুজরাতের ইনিংস। ৩৭ বলে ৫০ রান করে অপরাজিত থাকেন ওয়াশিংটন। বেঙ্গালুরুর বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল রাসিখ। ৩ উইকেট নেন তিনি। ২ করে উইকেট নেন হেজ়লউড ও ভুবনেশ্বর। বোলারেরা জয়ের যে ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, তা কাজে লাগিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন ব্যাটারেরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- আইপিএলের ফাইনাল ৩১ মে, রবিবার। অহমদাবাদে হবে এ বারের ফাইনাল। নতুন কোনও দল এ বার চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে না।
- ২৮ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। গত বছর প্রয়াত ১১ সমর্থকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বার হয়নি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
- এখনও পর্যন্ত আইপিএলের গ্রুপ পর্বের ৭০টি ম্যাচের সূচি ঘোষণা হয়েছে। প্রথমে ২০টি ম্যাচের সূচি জানিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। পরে বাকি ৫০টি ম্যাচেরও সূচি ঘোষণা করেছে তারা। তবে প্লে-অফের সূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
-
২০:১৬
আইপিএল ফাইনাল শুরুর ২২ বল পরেই কমলা টুপি নিশ্চিত হয়ে গেল বৈভবের, আরও দু’টি পুরস্কার পেতে পারে ১৫ বছরের ক্রিকেটার -
১৭:৪৬
আইপিএলে ব্যাট-বলের ভারসাম্য আনতে তিন দাওয়াই সচিনের, সূর্যবংশীর প্রতিভায় মুগ্ধ তেন্ডুলকর, কী পরামর্শ দিলেন? -
শতরান করে রাজস্থানকে হারিয়ে আইপিএলের ফাইনালে! তবু ৯৬ রান করা বৈভবের ইনিংস ভুলতে পারছেন না শুভমন
-
পন্থের পদত্যাগের পর লখনউয়ের পরবর্তী অধিনায়ক কে? দুই ক্রিকেটারের নাম প্রস্তাব কেকেআরের প্রাক্তন ব্যাটারের
-
আইপিএল থেকে বিদায় বিশ্বাসই হচ্ছে না বৈভবের! গুজরাতের কাছে হারের পর মুখ খুলল সূর্যবংশী, লম্বা বার্তা সমর্থকদের