E-Paper

রাজকোষের অসুখ

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই হোক, বা সামাজিক ক্ষেত্রে, শৃঙ্খলা হল উদ্দেশ্য সাধনের উপায়, লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথ। বিধিনিয়ম পালন করাকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে ধরে নিলে মূল কাজ ব্যাহত হতে বাধ্য।

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৩

আর্থিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ফল ভাল হয়নি। নীতি আয়োগের মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গ দেশের ১৮টি বড় রাজ্যের মধ্যে শেষের দিক থেকে তৃতীয়। গত বছর এ বিষয়ে প্রথম রিপোর্ট বেরোয়, সে বারও পশ্চিমবঙ্গ শেষ সারিতেই ছিল। এ বারে কিছু উন্নতি হয়েছে— সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষেবা ক্ষেত্রে মূলধনি খাতে খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। রাজ্যের নিজস্ব আয়ও যথেষ্ট বেড়েছে, দু’বছরে প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি। রাজকোষ ঘাটতি লাগামের মধ্যেই রয়েছে। রাজ্যের নম্বর কমেছে প্রধানত ঋণের বিপুল অঙ্কের জন্য, এবং পুরনো ঋণের উপর জমতে থাকা সুদ মেটানোর খরচের বাহুল্যে। রাজস্ব আয়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচ হয়ে যাচ্ছে পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে। ফলাফল নিয়ে বিশেষ প্রশ্নের অবকাশ নেই— পশ্চিমবঙ্গের ঋণের পরিমাণ রাজ্যের জিডিপি-র ৩৮ শতাংশ, যা বাস্তবিকই ভারতে সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলির সঙ্গে রাখে পশ্চিমবঙ্গকে। প্রশ্ন যদি কিছু থাকে, তবে তা নীতি আয়োগের পরীক্ষাপত্রটি নিয়ে। ‘আর্থিক স্বাস্থ্য’ বলতে কী বোঝায়, আর তা নির্ণয় করে কী উদ্দেশ্য সাধিত করতে চায় নীতি আয়োগ, তার বিচারকে রাখা চাই কেন্দ্রে। এই মাপকাঠির প্রধান লক্ষ্য বিভিন্ন রাজ্য সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা, অর্থাৎ আয় অনুসারে ব্যয়ের পরিমাপ, এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাদের মধ্যে ‘প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব’ তৈরি করা। কিন্তু মাপকাঠি তৈরির সময়ে এও ভাবা জরুরি যে, এই প্রতিযোগিতার লক্ষ্য কী?

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই হোক, বা সামাজিক ক্ষেত্রে, শৃঙ্খলা হল উদ্দেশ্য সাধনের উপায়, লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথ। বিধিনিয়ম পালন করাকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে ধরে নিলে মূল কাজ ব্যাহত হতে বাধ্য। আয়-ব্যয়ে সমতা রাখা অবশ্যই কাম্য, কিন্তু ব্যয়সঙ্কোচ, বা ঋণে রাশ টানাই কোনও নির্বাচিত সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে না। জনগণের সমর্থনে গণতন্ত্রে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তার প্রধান কর্তব্য জনগণের চাহিদা এবং প্রয়োজনগুলি বোঝা, বিশেষত যদি সেগুলি হয় এমন সব জরুরি চাহিদা যেগুলি অবিলম্বে মেটানো দরকার। কল্যাণমুখী প্রকল্পের জন্য টাকার চাহিদা যদি রাজকোষ থেকে মেটানো না যায়, তা হলে ঋণ করেই সে খরচ জোগাতে হবে। চাহিদায় সাড়া না দেওয়া সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক দায়হীনতার পরিচয়, শৃঙ্খলার পরিচয় নয়। এটা লক্ষণীয় যে নীতি আয়োগের মাপকাঠিতে যে রাজ্যগুলি রয়েছে নীচের দিকে, সেগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে কেরলও। ভারতের যে রাজ্যটি মানব উন্নয়নের সূচকে, নারী অধিকার এবং শ্রমিক অধিকারের নিরিখে ‘মডেল’ বলে গণ্য হয়, সেই কেরলেরও ঋণের হার (রাজ্যের জিডিপি-র ৩৭.৬ শতাংশ) পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি, যা জাতীয় হারের তুলনায় (জিডিপি-র ২৯.৮ শতাংশ) বেশি। তা বলে এই কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি বজায় রাখতে ঋণগ্রহণকে কি ‘বিশৃঙ্খল’ বলা চলে?

মানব উন্নয়ন সূচকের নিরিখে ভারতে কেরলের স্থান দ্বিতীয়, গুজরাতের স্থান ২৫তম। নীতি আয়োগের ‘আর্থিক স্বাস্থ্য’ মাপকাঠিতে এই দু’টি রাজ্যের অবস্থান ঠিক বিপরীত— গুজরাত রয়েছে শীর্ষের দিকে, আর পিছনের দিকে কেরল। তা হলে কি আর্থিক স্বাস্থ্যে উন্নতির সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টির উন্নতির কোনও সম্পর্ক নেই? নীতি আয়োগকে অতএব আর্থিক স্বাস্থ্য মাপার সূচকগুলি নিয়ে পুনরায় বিবেচনা করতে হবে। অন্য দিকে, অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলিকেও সতর্ক হতে হবে, যাতে ‘জনকল্যাণ’-এর যুক্তিখাত দিয়ে বিভিন্ন ধারার নির্বাচনী চটকদারির প্রকল্পে টাকা না বয়ে যায়। প্রসঙ্গত স্মরণ না-করে উপায় নেই, পশ্চিমবঙ্গে পুরনো ঋণের বোঝা এখন ৬.৪ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে রাজ্যের রাজস্ব আয়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচ হচ্ছে। এই তথ্য-পরিসংখ্যানকে লঘু ভাবে নেওয়া চলে না। অপচয়ের সময় এটা নয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal government financial health

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy